এক রাতে কারও ব্যক্তিগত অর্জনে রেকর্ডের পাতা সমৃদ্ধ হলো, কারও জন্য অপেক্ষা করল অপ্রত্যাশিত হতাশা! উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের মঙ্গলবারের রাতটি ছিল এমনই বৈপরীত্যে ভরা। হ্যারি কেইন জোড়া গোল করে লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে গেলেও বায়ার্ন মিউনিখ জয় পেল না। ছয়বারের ইউরোপসেরাদের রুখে দিয়ে আলোচনায় উঠে এল নরওয়ের ক্লাব ভাইকিং। অন্যদিকে পিছিয়ে পড়েও গালাতাসারাইকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছে বার্সেলোনা। গত রাতের আরেক বড় অঘটনে ইন্টার মিলানকে হারিয়েছে ক্লাব ব্রুগে।
রেকর্ডের আলোয় কেইন
বায়ার্নের হয়ে হ্যারি কেইনের ধারাবাহিক গোলের গল্পটা নতুন নয়। তবে ভাইকিংয়ের বিপক্ষে তার জোড়া গোল ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকায় যোগ করেছে বিশেষ একটি অধ্যায়। চ্যাম্পিয়নস লিগে ৩০ বছর বয়স পার করার পর গোলসংখ্যায় মেসিকে ছাড়িয়ে গেছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
ভাইকিংয়ের মাঠে শুরুটা অবশ্য ছিল বায়ার্নের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। ম্যাচের ৭১ সেকেন্ডেই জিয়ান্নি স্টেনসনেসের গোলে এগিয়ে যায় স্বাগতিকেরা। প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে পিটার ক্রিশ্চিয়ানসেন ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। দুই গোলে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় জার্মান জায়ান্টরা।
বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন কেইন। ৫৪ মিনিটে পেনাল্টি থেকে প্রথম গোল করার ছয় মিনিট পর হেডে দ্বিতীয়বার জালের দেখা পান তিনি। ৭১ মিনিটে লুইস দিয়াজের গোলে এগিয়েও যায় বায়ার্ন। কিন্তু মাইকেল অলিসে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর দশজনের দলে পরিণত হয় সফরকারীরা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৯০ মিনিটে হারমান হাউগেনের গোলে সমতা ফেরায় ভাইকিং।
দুই গোলের সুবাদে চ্যাম্পিয়নস লিগে ৩০ বছর বয়সের পর কেইনের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ ম্যাচে ৩৬। এই বয়সের পর মেসি ৪৮ ম্যাচে করেছিলেন ৩৫ গোল। আট ম্যাচ কম খেলেই আর্জেন্টাইন তারকাকে ছাড়িয়ে গেলেন ইংলিশ স্ট্রাইকার। তবে এই তালিকায় এখনো সবার ওপরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। ৩০ বছর পেরিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ৭৪ ম্যাচে তার গোল ৬৮টি।
কেইনের সামনে রয়েছে আরেকটি বড় রেকর্ডের হাতছানি। চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা নয় ম্যাচে গোল করে রবার্ট লেভানডফস্কি ও রুড ফন নিস্টেলরয়ের পাশে বসেছেন তিনি। রোনালদোর টানা ১১ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড ছুঁতে হলে পরবর্তী দুই ম্যাচেও গোল করতে হবে তাকে।
বার্সার চার গোলের জবাব নেই
বায়ার্ন যেখানে শেষ মুহূর্তে জয় হারিয়েছে, বার্সেলোনা সেখানে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে নিজেদের হাতে। ইস্তাম্বুলে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে শুরুতে গোল হজম করেও শেষ পর্যন্ত ৪-১ ব্যবধানের জয় তুলে নিয়েছে হান্সি ফ্লিকের দল।
২৮ মিনিটে আলেক্সেই বাতরাকভের গোলে এগিয়ে যায় স্বাগতিকেরা। তবে বিরতির আগে ৪৩ মিনিটে জোয়াও ক্যানসেলোর বাঁকানো শট বার্সেলোনাকে সমতায় ফেরায়। দ্বিতীয়ার্ধে যেন অন্য এক বার্সাকে দেখা যায়। ৫০ মিনিটে লামিনে ইয়ামালের ক্রস থেকে ফেরমিন লোপেজের হেডে এগিয়ে যায় কাতালানরা। তিন মিনিট পর ইয়ামালের দারুণ পাস থেকে ব্যবধান বাড়ান অ্যান্থনি গর্ডন। ৬৫ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা করিম আদেয়েমি করেন চতুর্থ গোল।
এই জয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফ্লিকের অধীনে বার্সেলোনার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ ম্যাচে ৮৪। ১৯৯২-৯৩ মৌসুম থেকে অন্তত ২০ ম্যাচ পরিচালনা করা কোচদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতায় তার অধীনে বার্সেলোনার গোলের গড় সর্বোচ্চ।
ইন্টারের দুঃসময়, ব্রুগের উৎসব
মঙ্গলবারের রাতটা ভালো কাটেনি ইন্টার মিলানেরও। সাত গোলের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ইতালিয়ান ক্লাবটিকে ৪-৩ গোলে হারিয়েছে ক্লাব ব্রুগে। এই হারে চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রথমবারের মতো টানা চার ম্যাচে পরাজয়ের স্বাদ পেল ইন্টার।
ব্রুগের হয়ে নিকোলো ত্রেসোলদি করেন জোড়া গোলের পাশাপাশি হ্যাটট্রিক। ইন্টারের হয়ে লাউতারো মার্তিনেজ ও আনজে-ইওয়ান বনি গোল করলেও হার এড়ানো যায়নি। ৮৭ মিনিটে রোমিও ভেরমান্টের গোলটি শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দেয়।
রাতের অন্য ম্যাচগুলোতেও ছিল বড় দলের জয়-পরাজয়ের গল্প। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ২-০ গোলে হারিয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। লিলের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জিতেছে আর্সেনাল। নাপোলিকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে ভিয়ারিয়াল। এ ছাড়া পিএসভিকে হারিয়েছে লাইপজিগ।
মঙ্গলবারের রাতটি চ্যাম্পিয়নস লিগে একাধিক বার্তা দিয়েছে। ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিক থেকে কেইন ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে, দলীয় পারফরম্যান্সে বার্সেলোনা দেখিয়েছে দাপট। আর বায়ার্ন ও ইন্টারের মতো বড় ক্লাবের হোঁচট আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ইউরোপের এই মঞ্চে নামের ভারে ম্যাচ জেতা যায় না।
