সরকার গঠনের মাত্র আট মাসের মাথায় বিএনপি সরকারের তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। একই সময়ে পদত্যাগ করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যও। এসব পদত্যাগের পেছনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ছিল বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া কারণ ও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত কারণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
সবশেষ সোমবার (১৯ অক্টোবর) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান। এ ছাড়া সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিও পদত্যাগ করেছেন।
ইশরাকের পদত্যাগের নেপথ্যে কী
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইন-সংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় তার হাতে এবং সঙ্গে থাকা সহযোগীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। অস্ত্র হাতে অভিযানের ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিএনপি ও সরকারের উচ্চপর্যায়েও অসন্তোষ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আলোচনা রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশনার পর সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক।
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। কেউ মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কাজ করলে তিনি যত ঘনিষ্ঠই হোন না কেন, প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন। তার ভাষ্য, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
সাড়ে তিন মাসেই পদত্যাগ করেন দীপেন দেওয়ান
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে এর আগে পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন তিনি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তা গৃহীত হয়।
পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেন দীপেন দেওয়ান। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দায়িত্ব পালনে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বাড়াতে মন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তবে তার পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ নিয়ে মতপার্থক্য এবং রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম পরিচালনা নিয়েও আলোচনা ছিল।
দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন। সে সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছিলেন, পদত্যাগের ঘটনা সম্পর্কে তারাও অবগত ছিলেন না।
এদিকে দীপেন দেওয়ানকে পুনর্বহাল ও তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ করেন তার অনুসারী-সমর্থকেরা। তাদের দাবি ছিল, তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে।
জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘটনা
গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। তবে একই দিন তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর আগের দিন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আন্দালিভ রহমান পার্থ। ফলে জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়। তার মন্ত্রিত্ব কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
সংসদ সদস্য মিষ্টির পদত্যাগ
মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি পদত্যাগ করতে হয়েছে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও।
রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
আট মাসে পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা
সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া কারণের পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে।
তবে প্রতিটি পদত্যাগের কারণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে, আবার কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। ফলে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত বক্তব্যকে পৃথকভাবে দেখা জরুরি।
The post ৮ মাসে বিএনপি সরকারের তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ appeared first on SATV.
