মসজিদভিত্তিক, সমাজভিত্তিক, মহল্লাভিত্তিক সর্বদলীয় মাদকসেবন বিরোধী কমিটি গঠন করে চিহিৃত মাদকসেবনকারীদের ও মাদকসেবক পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
বিগত ১৪ অক্টোবর দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ’পানির নিচে ইয়াবা পাচারের গোপন নৌযান,এক চালানে আনতে পারে ৩০ লাখ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। পরে একই সংবাদ কালেরকন্ঠেও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নাফ নদীর পানিতে হাত দিয়ে মাছ ধরার ভান করে পানির নিচ দিয়ে এগিয়ে আসছে কাঠের তৈরী বিশেষ এক ক্যারিয়ার। সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকলের জটিল ব্যবস্থা। এই কৌশলে মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে ঢোকানো হচ্ছে ইয়াবার বড় চালান। বিজিবির দাবী, ডুবন্ত এই কাঠের ক্যারিয়ারে একসঙ্গে ৩০ লাখ ইয়াবা আনা সম্ভব। এমন অভিনব পাচার পদ্ধতির সন্ধান পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ জহিরুল ইসলাম প্রকাশ করেন। ১২ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়ার মনিরের ঘেরের মাচাং ঘরের পাশে চার থেকে পাঁচ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দেখতে পায় পালংখালী বিজিবির একটি টহল দল। তাদের চ্যালেঞ্জ করলে পালানোর চেষ্টা কালে বেলাল ও খোরশেদ নামের দুইজনকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল ও ঘেরে তল্লাশী করে একটি বিদেশী পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন,১১ রাউন্ড গুলি ও একটি মুঠোফোন পাওয়া যায়। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় নয়টি কপিকল, কাঠের তৈরী একটি ডুবন্ত ক্যারিয়ার, ক্যারিয়ার টানার জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার স্টিলের তার, একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পর্ন ব্যাটারী ও একটি বৈদ্যুতিক মোটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। দেশের ভিতরে ইয়াবা সহ বিভিন্ন মাদকের চাহিদা থাকায় তা দেশের ভিতরে পাচারের জন্য অত্যাধুনিক পদ্ধতি আবিষ্কার করছে পাচারকারীরা। চাহিদা থাকলে সরবরাহ আসবেই। মাদকসেবন বন্ধ করা গেলে, মাদকের চাহিদা বন্ধ হয়ে গেলে কেউ আর ঝুকি নিয়ে মাদক আমদানী করবে না। চাহিদা থাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ পিস ইয়াবার চালান ধৃত হওয়ার সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়।
১৬ অক্টোবর দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সচিত্র সংবাদে জানা যায়, কক্সবাজারে ১৩জন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে এবং কক্সবাজার সদরের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও সহকারী কমিশনারের পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ১০ জন মাদক সেবনকারীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে ঘটনাস্থলে বিচার করে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। একজন পুলিশ সদস্য ডোপ-টেস্টে মাদকাসক্ত প্রমাণিত হওয়ায় চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে এক জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। কক্সবাজার মাঝের ঘাটের মসজিদের মুসল্লিরা নামাজের পরে মানববন্ধন ও মিছিল করে মাদক সেবন করা থেকে বিরত থাকার জন্য জনমত গঠনের উদ্যাগ নিয়েছেন। সকল মসজিদ কমিটিকে একই ধরনের মাদকবিরোধী প্রচার প্রচারণা চালানো উচিত । যে কয়েক জন মাদকসেবন না করার সামাজিক দাবী অমান্য করে মাদকসেবন অব্যাহত রাখলে প্রশাসনে খবর দিয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করে কারাগারে প্রেরণ করা হলে মাদকসেবন বন্ধ হয়ে যাবে। মাদক বিরোধী সাধারণ মানুষের যে কোন উদ্যাগকে প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা করা উচিত। মাদক চোরাচালানী /আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী সংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। প্রতি জেলায়-উপজেলায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু মাদক পাচারকারীদের ধরে বিশেষ আদালত গঠন করে মৃত্যুদন্ড,যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলে ইয়াবা/মাদক আমদানী/পাচার বন্ধ হবে না। সরকারী/বেসরকারী চাকুরী,স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি,ড্রাইভিং লাইসেন্স,আমদানী রপ্তানীসহ ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা পেশাজীবীদের সনদ প্রদানের সময়, কমিউনিটি পুলিশের সদস্য হওয়ার জন্য, রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যপদসহ নেতৃত্বের পদ দেওয়ার আগে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাথে মাদকাসক্ত নন মর্মে ডোপ-টেস্ট রির্পোট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তারা সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন বলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যাগ নিলে দেশে মাদক সেবন কঠোরভাবে নিরুৎসাহীত করা ও বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয়। ইদানিং পত্রিকায় মাদক সেবনকারীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে ঘটনাস্থলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে প্রেরণ করার ও সামাজিকভাবে মাদক পাচার ও মাদকসেবন বিরোধী মিটিং, মিছিল, মানববন্ধন হওয়া সংক্রান্ত আশাজাগানিয়া সংবাদও প্রচার হচ্ছে যাতে সরকারের, প্রশাসনের ও স্থানীয়ভাবে জনগণের উৎসাহজনক আন্তরিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। হীন রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সরকারী দল ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে মাদকসেবনের বিরুদ্ধে আর বিলম্ব না করে এখনই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মসজিদভিত্তিক, সমাজভিত্তিক, মহল্লাভিত্তিক সর্বদলীয় মাদকসেবন বিরোধী কমিটি গঠন করে চিহিৃত মাদকসেবনকারীদের ও মাদকসেবক পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। দেশে মাদকসেবন বন্ধ করার মাধ্যমে মাদকের চাহিদা কমিয়ে ইয়াবা ও মাদক পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে নিত্য নতুন কৌশলে মাদক পাচার/ব্যবসা স্বংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে। সমাজে ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাদকের পৃষ্টপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক, বিক্রেতা ও গডফাদারও আর সৃষ্টি হবে না। দেশে চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, হত্যার মত জঘন্য অপরাধপ্রবণতা কমে মারাত্মক অবনতিশীল আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নতি হবে।
মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মাদকসেবীদের হাতেনাতে ধৃত করে আইনানুগভাবে দন্ডিত করে সাথে সাথে কারাগারে প্রেরণ করার সংবাদে আমজনতা কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। অভিজ্ঞ মহলের অভিমত, বেশী বেশী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাদকাসক্তদের ঘটনাস্থলে বিচার করে শাস্তি দেওয়া হলে ধৃত ও দন্ডিত হওয়ার ভয়ে মাদকসেবন দ্রুত কমে যাবে এবং দেশের সর্বক্ষেত্রে মহামারির মত সংক্রামিত দুর্নীতি দুদকের ’ফাঁদ মামলার’ মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে ধৃত করে আইনের আওতায় আনা হলে দুর্নীতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
