সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি মুহূর্তে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা, উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিমেরিট পয়েন্ট চালু এবং একই অপরাধ বারবার করলে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রেখে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) প্রণীত প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনটিতে ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা ও দুটি তফসিল রয়েছে।
‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সংস্থাপন শাখার উপসচিব আল-আমীন মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করেছি, যা শিগগিরই মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।’
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনাকে দেশের জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন প্রাণ হারান। অন্যদিকে, বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব উদ্ধৃত করে এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
২০২৭ সালের মধ্যে আইন প্রণয়নের লক্ষ্য
বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনে এ অঙ্গীকার করা হয়।
চলতি বছরের ২০ ও ২১ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অঙ্গীকারটি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
এ ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা ও বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করে খসড়া তৈরির জন্য কমিটি গঠন করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। গত ১৪ অক্টোবরের এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে আইনটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
সড়ক নকশা ও প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
প্রস্তাবিত আইনে সড়ক ও মোড় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নকশা করা, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং সড়ক নিরাপত্তা অডিট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
পথচারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত ফুটপাত, র্যাম্প বা লিফটযুক্ত ফুটওভার ব্রিজ এবং নিরাপদ রিফিউজ আইল্যান্ড। নারী, অন্তঃসত্ত্বা, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণপরিবহন ব্যবহারের সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিবহন পরিচালনাকারীদের জন্যও বাধ্যবাধকতা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, রাম্বল স্ট্রিপ ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের নিরাপত্তা মূল্যায়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্টার-রেটিং ব্যবস্থা চালু এবং পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে।
গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ
খসড়া অনুযায়ী, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন বা একই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার, ধূমপান, খাবার খাওয়া কিংবা উচ্চ শব্দে গান শোনার মতো মনোযোগ বিঘ্নকারী আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। চালকের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে—এমন যাত্রীদের আচরণও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্য সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ১৪ বছরের কম বয়সী অথবা ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুদের সামনের আসনে বসানো নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি উপযুক্ত শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রয়োজনে পুলিশ ও অনুমোদিত কর্মকর্তারা ব্রেথ অ্যানালাইজার বা পরীক্ষাগারের মাধ্যমে চালকের শরীরে অ্যালকোহলের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে পারবেন।
চালক ও আরোহীর জন্য হেলমেট বাধ্যতামূলক
মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী—উভয়ের জন্য বিএসটিআই-অনুমোদিত মানসম্মত হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের মোটরসাইকেলের যাত্রী হিসেবে বহন নিষিদ্ধ করার কথাও বলা হয়েছে।
সড়কের অবস্থা অনুকূল হলে সাইকেলের জন্য পৃথক লেন নির্ধারণ এবং সাইকেল চালকদের হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পথচারীদের নির্ধারিত ফুটপাত ব্যবহার এবং জেব্রা ক্রসিং ও রিফিউজ আইল্যান্ডের মতো নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপার হতে হবে।
ডিমেরিট পয়েন্ট, অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তি
প্রস্তাবিত ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সে পয়েন্ট কাটা বা জমার বিধান থাকবে। নির্ধারিত সীমায় পয়েন্ট পৌঁছালে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ নির্ধারিত শাস্তি বা জরিমানা দ্বিগুণ করার বিধানও রাখা হয়েছে খসড়ায়।
প্রস্তাবিত আইনের ৭৪ ধারা অনুযায়ী, ফুটপাত ব্যবহার না করলে একজন পথচারীকে প্রথমবারের অপরাধে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা করা যেতে পারে।
‘গোল্ডেন আওয়ারে’ বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের সংকটময় ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ বিনামূল্যে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
খসড়ায় বলা হয়েছে, অগ্রিম টাকা বা টিকিটের শর্ত ছাড়াই হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধানের ঘাটতি রয়েছে বর্তমান আইনি কাঠামোয়। এ ঘাটতি দূর করতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো, অর্থের অভাবে বা প্রশাসনিক জটিলতায় যেন দুর্ঘটনায় আহত কেউ জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন এবং দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা
দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে এগিয়ে এলে পুলিশি হয়রানি, ফৌজদারি মামলা বা আদালত-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থেকে অনেকেই পিছিয়ে থাকেন। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারীদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়ার লক্ষ্য, আইনি জটিলতার ভয় কমিয়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনাকবলিতদের উদ্ধারে উৎসাহিত করা, যাতে জরুরি সময়ে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
কেন্দ্রীয় ডাটাবেস ও গবেষণা তহবিল
সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রকাশ ও সংরক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডাটাবেস গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়মিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে।
এ ছাড়া বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করা এবং সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য পৃথক গবেষণা তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চালকদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা তদন্ত, দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা ব্যয় এবং যাত্রীবিমার মতো বিষয়ও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দুটি তফসিলে দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবা এবং অ্যালকোহল বা অন্য মাদকদ্রব্য সেবন করে যানবাহন চালানো-সংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছে।
কেন পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন
খসড়ায় বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ সংশোধন করেও সড়ক প্রকৌশল, যানবাহনের মান, গতি ব্যবস্থাপনা, পথচারীর সুরক্ষা, জরুরি চিকিৎসা, গবেষণা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়গুলো পর্যাপ্তভাবে সমাধান করা কঠিন।
এ কারণে আন্তর্জাতিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। তবে খসড়াটি এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে; এর চূড়ান্ত বিধান ও বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অনুমোদন ও পরবর্তী আইন প্রণয়নপ্রক্রিয়ার ওপর।
The post সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়া তৈরি, কী আছে এতে? appeared first on ভোরের চেতনা.
