রাজবংশী গৃহবধূর বেশে প্রতিমাEi Samay
Published on
:
2 min read
পিনাকী চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার
বাঙালির কাছে ‘দুগ্গা’ ঠাকুর মেয়ের মতো। চার দিনের জন্য কৈলাস থেকে মেয়ে তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়িতে আসে, এমনটাই মনে করেন অনেকে। আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের ভাটিবাড়ি তল্লাটের বোরাগাড়ি হরিমন্দিরের দুর্গাপুজোয় সেই ভাবনাই ফুটে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, এ বছর ১২৬ বছরে পদার্পণ করল এই পুজো। প্রাচীন এই পুজোয় দেবী দুর্গা সেজে ওঠেন চিরাচরিত রাজবংশী গৃহবধূর সাজে। নিষ্ঠা, সাবেকিয়ানা ও প্রাচীন রাজবংশী রীতিনীতি মেনেই আজও হয় পুজো।
কথিত আছে, এক সময়ে এই তল্লাটের প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন দ্বীপচন দাস। তাঁর দুই স্ত্রী ১২৬ বছর আগে বোরাগাড়ি হরিবাড়ি মন্দিরের গোড়াপত্তন করে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তাঁরা মন্দিরের নামে জমিও দান করে যান। তাঁদের আমল থেকেই ওই মন্দিরের জমিতে ফসলের চাষ হয়। জমির সেই ফসল বিক্রি করেই সারা বছর মন্দিরের পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। দুর্গাপুজোর আয়োজনও করা হয় ওই ফসল বিক্রির টাকাতেই।
পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেবীর সাজসজ্জা। বিভিন্ন সময়ে ভক্তদের দেওয়া অলঙ্কার মন্দির কমিটির তত্ত্বাবধানে লকারে রাখা থাকে। পুজোর আগে সেই অলঙ্কার বের করে সাজানো হয় প্রতিমাকে। পুজোর ভোগে থাকে মাংসও। অষ্টমী, নবমী ও দশমী, তিন দিনই ভক্তরা পাঁঠা, হাঁস ও পায়রা বলি দেন। প্রতিদিন পুজো শেষে সেই প্রসাদ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ভক্তদের মানত, মন্দিরের নিজস্ব প্রথা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ মিলিয়ে এই পুজো হয়ে ওঠে এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
বোরাগাড়ি হরিবাড়ি মন্দির দুর্গাপুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ প্রদীপ দাস বলেন, ‘আমাদের মায়ের পুজোয় হাঁস, পাঁঠা ও পায়রার মাংস ভোগ দেওয়া হয়। সেই জন্য অষ্টমী, নবমী ও দশমী তিন দিনেই এখানে পশু-পাখি দেবীকে উৎসর্গ করা হয়। ভক্তরাই মায়ের কাছে তাঁদের মানত করা প্রাণী উৎসর্গ করেন।’
ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি এলাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে এই মন্দিরের। ভাটিবাড়ি তল্লাট ভাওয়াইয়া গান-সহ অন্যান্য লোকসংগীত, পালাগান ও যাত্রাগানের জন্য পরিচিত। এক সময় গুণেশ্বর অধিকারীর লেখা রাজবংশী যাত্রাপালা ‘ময়নার চক্ষুর জল’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই যাত্রাপালার প্রথম মহড়া হয়েছিল বোরাগাড়ি হরিমন্দিরেই। আজও এলাকার শিল্পী ও যাত্রাগানের দলের সদস্যরা অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে মহড়া দিয়ে যান।
