॥ আয়েশা সিদ্দিকা ॥
দেশে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং জাতীয় বিদ্যুৎখাতে বড় ধরনের চাপ ও সঙ্কট সৃষ্টি করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যা দেশে তীব্র লোড শেডিং তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে, যা দেশের মোট দৈনিক বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করছে। বেশিরভাগ চার্জিং হাব বা গ্যারেজ মূল গ্রিড বা রাস্তার লাইট থেকে অবৈধভাবে হুকিং বা সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ করে। এতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। বেশিরভাগ রিকশা রাতে চার্জ দেওয়া হয়, ফলে মধ্যরাতে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গিয়ে স্থানীয় ট্রান্সফর্মারের ওপর চাপ পড়ে। এর ফলে ভোল্টেজ কমে যাওয়া এবং কোনো কোনো এলাকায় লোডশেডিং বা ব্ল্যাকআউট দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের সামগ্রিক ঘাটতির পেছনে জ্বালানি সঙ্কটও একটি বড় কারণ, তবে অটোরিকশার অপরিকল্পিত ও অবৈধ চার্জিং এ সঙ্কটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, রিকশাগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে নাম্বার প্লেট, কিউআর কোড এবং চালকদের নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যারেজগুলোর জন্য আলাদা বিদ্যুৎ মিটার ও আলাদা ট্যারিফ নির্ধারণ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুরনো ও বেশি বিদ্যুৎ খরচকারী সীড-অসিড ব্যাটারির পরিবর্তে উন্নত প্রযুক্তির লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতেও সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
মূলত, অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে যাওয়া এসব রিক্সার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন দিনের চেয়ে মধ্যরাতেই চাহিদা বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এ রিকশাগুলোই মধ্যরাতে গিলে খাচ্ছে (চার্জে) ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে বাধ্য হয়ে সরকারকে উচ্চমূল্যের তেলের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকট ও এলপিজির উচ্চমূল্যের কারণে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহারও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে দিনে নতুন করে আরও প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। যা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না। এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সূত্রে জানানো হয়েছে, বৈদ্যুতিক চুলা নয়, সরকারের মূল চিন্তার বিষয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। কাগজে-কলমে ‘পিক’ ও ‘অফ-পিক’ শব্দ থাকলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। মধ্যরাতে এখন দিনের চেয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকছে। সূত্রমতে, দেশে কত ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে, এর হিসাব কারও কাছে নেই। তবে মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট কম থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা থাকছে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাত ১টায় (অফ-পিক) বিদ্যুতের চাহিদা দিনের সর্বোচ্চ চাহিদাকে (পিক) ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা না কমায় বাধ্য হয়ে সরকারকে উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলের (প্রতি ইউনিট ২৫ টাকার বেশি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখতে হচ্ছে। পিডিবি, ডেসকো ও ডিপিডিসির হিসাব অনুযায়ী, মধ্যরাতে কেবল ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
আসলে দেশে ঠিক কত ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বুয়েটের পুরকৌশল সূত্রমতে, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে; যার অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ শুধু ঢাকায়ই চলাচল করে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোকে অনেকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। এটিও একটি অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা।
একটি বেসরকারি গবেষণায় দেশে প্রায় ৬০ লাখ রিকশা থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক সেমিনারে জানানো হয়েছে, দৈনিক ৩/৪ হাজার নতুন রিকশা রাস্তায় নামছে। দেশীয় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ব্যাটারিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইমরান করিমের মতে, বর্তমানে বাজারে ৫০ লাখের বেশি রিকশা চালু আছে এবং প্রতি মাসে অন্তত ৫ লাখ নতুন ব্যাটারি বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ছাড়া সেখানে তেমন কোনো যানবাহন নেই। যা জাতীয় পাওয়ার গ্রীডে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। রাজধানীর রিকশার পাইকারি বিক্রেতাদের দাবি অনুযায়ি, এক বছর আগেও তিনি দৈনিক ১০/১৫টি রিকশা বিক্রি করতেন। তার মতো ঢাকায় হাজারের মতো দোকান আছে। এখন দৈনিক একটির বেশি বিক্রি হয় না।
অপরদিকে বৈদ্যুতিক চুলার কারণেও পাওয়ার গ্রিডে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গ্যাস-সঙ্কট ও এলপিজির উচ্চমূল্যের কারণে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার (ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড) ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশীয় কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহৃত হচ্ছে। ওয়ালটনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স সূত্র গণমাধ্যমকে বলেছে, ২০২৪ সালের আগে মাসে গড়ে ১০ হাজার চুলা বিক্রি হলেও গত আগস্টে তা ৪ লাখে গিয়ে ঠেকেছিল। একটি দেশীয় বৈদ্যুতিক চুলা কোম্পানির হিসাবে, বৈদুতিক চুলা ব্যবহার করলে দিনে ২ থেকে ৩ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। পিডিবির মতে, এসব চুলার কারণে দিনে নতুন করে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা কয়েক বছর আগে ছিল না। যা নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি করছে।
তবে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখা দিয়েছে। সঙ্কটের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা দেখছে সবুজ জ্বালানি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘সোলশেয়ার’। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ রিকশায় ‘লিড-অ্যাসিড’ ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পরিবর্তে আধুনিক ‘লিথিয়াম-আয়ন’ ব্যাটারি ব্যবহার করা গেলে প্রতিদিন ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
সোলশেয়ারের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে দেখা গেছে, সারাদিন রিকশা চালানোর পরও লিথিয়াম ব্যাটারিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ মজুত থাকে। এ চার্জ দিয়ে রাত ১২টার আগে উলটো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। রাজধানীর উত্তরখানের হোসনে আরা এন্টারপ্রাইজ নামের গ্যারেজ ইতোমধ্যে ‘নেট মিটারিং’ সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের ব্যাটারি থেকে ১ হাজার ৭২ ইউনিট বিদ্যুৎ ডেসকোর লাইনে যুক্ত করে সফলতার প্রমাণ দিয়েছে। যা খুবই ইতিবাচক।
সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লিড অ্যাসিডের ব্যাটারিতে দিনে ১৩০-১৩৫ টাকার আর লিথিয়াম ব্যাটারিতে ৮০-৮৫ টাকার চার্জ লাগে। লিথিয়াম ব্যাটারি তিন বছর চলে। লিড ব্যাটারি এক বছরের কম চলে। হোসনে আরা এন্টারপ্রাইজে পরীক্ষামূলকভাবে ১৮ কিলোওয়াটের একটি সোলার প্যানেলও বসানো হয়। ওই প্যানেল দিয়ে দিনে তিনটি রিকশার লিথিয়াম ব্যাটারির চার্জ দেওয়া যায়। তারা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ খাতের এই চ্যালেঞ্জকে বড় সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব। সোলশেয়ার সূত্র জানিয়েছে, আমাদের দেশের ৬০ লাখ ইলেকট্রিক রিকশাকে আমরা চাইলেই একটি স্মার্ট, লিথিয়ামচালিত ‘ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্টে’ বদলে ফেলতে পারি এমন সব ব্যাটারি দিয়ে, যা গ্রিডের সঙ্গেও কানেক্ট করা যাবে, আবার দেশেই রিসাইকেল করা যাবে। এ কাজটি যদি আমরা বড় পরিসরে করতে পারি, তাহলে বছরে আমাদের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাঁচবে।
দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট চলছে। রাজধানী ঢাকাও এ থেকে আলাদা নয়। আর ব্যাটারী চালিত রিকশাগুলো এখন পাওয়ার গ্রিডের ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। একই সাথে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস সঙ্কটের কারণে বৈদ্যুতিক চুলাগুলোও সাবিক পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মূলত, লাগামহীন বেকারাত্বের কারণেই যুব সমাজ ব্যাটারি চালিত রিক্সার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এমনতাবস্থায় জাতীয় গ্রীডে চাপ কমানোর জন্য ব্যাটারি চালিত রিক্সার নির্ভরতা কমানোর জন্য বেকারত্ব হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিরুৎসাহিত করতে হবে ব্যাটারি চালিত রিক্সার বিষয়ে। এজন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক : শিক্ষিকা ও প্রাবন্ধিক।
