‘সন্ধ্যার পরে হঠাৎ প্রতিবেশী একজন বলছে, আমার স্বামীকে গুলি করছে। আমিও শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে দেখি, তার রক্তাক্ত দেহটা মাটিতে পড়ে আছে। আমার স্বামীর ওপর আগেও হামলা করেছে। আমি হত্যাকারীদের কঠিন বিচার চাই।’
এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ (৪০) ফকিরের স্ত্রী অনিন্দিতা সংমা।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজার এলাকায় বাড়ির পাশে দোকানে বসে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাবেক সেনাসদস্য ও সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে স্ত্রী আনন্দিতা সংঘ বলেন, ‘ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগে আমার স্বামী দোকান থেকে আমাকে আর বাচ্চাদের উঁকি দিয়ে দেখে গিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর আমরা যখন সবাই ভাত খেতে বসেছিলাম, তখন হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পাই। প্রথমে ভেবেছিলাম বাজারের বাচ্চারা হয়তো পটকা ফাটাচ্ছে। কিন্তু এর পরপরই একজন এসে খবর দেয়- আমার স্বামীর গায়ে গুলি লেগেছে। ছুটে গিয়ে দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি পড়ে আছেন।’
নিহত আলিফের স্ত্রী বলেন, ‘এর আগে বেশ কয়েক বার স্বামীর উপর হামলা চালানো হয়েছিল এবং তাকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছিল। সে বিষয়ে প্রশাসনকে অবহিত করা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেভাবে প্রকাশ্যে তাকে মেরে ফেলা হলো, জানি না এর সুষ্ঠু বিচার পাব কি না। আমি সরকারের কাছে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের ফাঁসি চাই।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে উতরাইল বাজারের একটি দোকানে বসেছিলেন আলিফ। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে চড়ে দুই সশস্ত্র যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। বিকট শব্দে স্থানীয়রা এগিয়ে আসার পর দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ঘটনাস্থলেই আলিফের মৃত্যু হয়।
আলিফ ফকির সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর যুক্ত হয়ে ছিলেন সাংবাদিকতা পেশায়। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসি বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি এবং ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজের পরিচালক ছিলেন।
আলি ফকিরের বাড়ি পার্শ্ববর্তী কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা এলাকায়। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বশুরবাড়ি বিরিশির দুর্গাপুরে বসবাস করে আসছিলেন।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ বলেন, ‘নিহত সাংবাদিকের শরীর পর্যালোচনা করে মাথা, গলা ও বুকসহ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার পরপরই জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।’
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ, ডিবি ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের একাধিক টিম কাজ শুরু করেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
