শীতকাল শিশুদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি এ সময় তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শিশুদের ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে নবজাতক, দুই বছরের কম বয়সী শিশু এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি। শীতকালে সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, ডায়রিয়া ও ত্বকের শুষ্কতাসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুর সুস্থ শৈশব নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা, সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার এবং সময়মতো চিকিৎসা।
টিকাদান: শিশুর সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
শিশুকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে নিয়মিত টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে নির্ধারিত সময়ে সব টিকা দিতে হবে। কোনো টিকা বাদ পড়লে বা নির্ধারিত সময়ে দেওয়া সম্ভব না হলে চিকিৎসক কিংবা নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রের পরামর্শ নিতে হবে।
শীতকালে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শিশুর বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। টিকাদানের মাধ্যমে শিশুকে বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
শীতের পোশাক ও শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখা
শীতকালে শিশুকে উপযুক্ত গরম পোশাক পরানো জরুরি। তবে অতিরিক্ত কাপড় পরিয়ে শিশুকে ঘামিয়ে ফেলা উচিত নয়। শিশুর বয়স, আবহাওয়া ও পরিবেশের তাপমাত্রা অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করতে হবে।
নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। তাই তাদের মাথা, হাত-পা ও শরীর যথাযথভাবে ঢেকে রাখতে হবে। তবে ঘরের ভেতরে অতিরিক্ত গরম পোশাক পরানোর প্রয়োজন নেই। শিশুর ঘাম হচ্ছে কি না, হাত-পা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
শিশুকে ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে। বাইরে নিয়ে গেলে আবহাওয়া অনুযায়ী গরম পোশাক পরাতে হবে। তবে ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা বন্ধ করে রাখা উচিত নয়। ঘর আরামদায়ক উষ্ণ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা
শীতকালে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। সর্দি-কাশি অনেক সময় সাধারণ সমস্যা হলেও কিছু ক্ষেত্রে তা গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের মতো রোগ শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, বুকের নিচের অংশ দেবে গেলে, দ্রুত শ্বাস নিলে, ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে গেলে কিংবা শিশু অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। নবজাতকের জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়াও উদ্বেগের কারণ। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শিশুকে ধোঁয়া, ধুলাবালি ও সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা জরুরি। ঘরে রান্নার ধোঁয়া জমতে দেওয়া যাবে না। অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে শিশুকে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যদের হাত পরিষ্কার রাখা এবং কাশি-হাঁচির সময় শিষ্টাচার মেনে চলাও সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।
পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি
শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। বয়স অনুযায়ী শিশুকে উপযুক্ত খাবার দিতে হবে। ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। ছয় মাস পূর্ণ হলে বুকের দুধের পাশাপাশি বয়স উপযোগী পরিপূরক খাবার শুরু করতে হবে।
শীতকালে অনেক শিশু পানি কম পান করতে চায়। তাই বয়স অনুযায়ী শিশুর পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ ছাড়া আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বড় শিশুদের জন্য পানি, স্যুপ এবং উপযোগী তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে।
শিশুর খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, মাছ, মাংস, ডালসহ পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। তবে শিশুর বয়স ও খাবার গ্রহণের সক্ষমতা অনুযায়ী খাবারের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। জোর করে খাওয়ানোর পরিবর্তে ধৈর্য ধরে শিশুকে খাওয়াতে হবে।
ত্বকের যত্ন ও গোসল
শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় শিশুদের ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। অনেক শিশুর ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব বা ফাটল দেখা দেয়। এ সমস্যা কমাতে গোসলের পর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুর ত্বকে উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
শিশুকে অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করানো উচিত নয়। কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা ভালো। গোসলের সময় খুব বেশি দীর্ঘ না করে দ্রুত শরীর মুছে শুকনো পোশাক পরিয়ে দিতে হবে। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করানো প্রয়োজন নেই; শিশুর পরিচ্ছন্নতা ও আবহাওয়া অনুযায়ী গোসলের সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সুগন্ধিযুক্ত সাবান, প্রসাধনী কিংবা ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে এমন পণ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী র্যাশ, ক্ষত, অতিরিক্ত চুলকানি বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘুম ও নিরাপদ পরিবেশ
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে শিশুর ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক ও নিরাপদ রাখতে হবে। ঘর অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম হওয়া উচিত নয়। শিশুকে পরিষ্কার ও শুকনো বিছানায় শোয়াতে হবে।
নবজাতককে ঘুমের সময় চিত করে শোয়ানো নিরাপদ। শিশুর মুখ ও নাক ঢেকে যায়—এমন ভারী কম্বল, বালিশ বা অতিরিক্ত নরম বিছানাপত্র ব্যবহার করা উচিত নয়। শিশুর ঘুমের জায়গায় এমন কিছু রাখা যাবে না, যা তার শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ঘর গরম রাখতে কয়লা বা অন্য কোনো জ্বালানি পোড়ানোর ব্যবস্থা ব্যবহার করলে বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বন্ধ ঘরে কয়লা বা অনিরাপদ জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে না। শিশুর ঘুমের জায়গায় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ প্রতিরোধ
শিশুকে সুস্থ রাখতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। শিশুকে স্পর্শ করার আগে, খাবার তৈরি ও খাওয়ানোর আগে এবং ডায়াপার পরিবর্তনের পর সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। শিশুর ব্যবহৃত কাপড়, তোয়ালে, বিছানাপত্র ও খাবারের পাত্র পরিষ্কার রাখতে হবে।
শিশুর আশপাশে কেউ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ কমানো উচিত। অসুস্থ ব্যক্তিকে শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখতে হবে। শিশুর ঘর ধুলাবালি ও ধোঁয়ামুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
শীতকালে ঠান্ডা এড়াতে জানালা-দরজা সব সময় বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। বরং নিরাপদভাবে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
শিশুর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সামান্য অসুস্থতাও দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই শিশুর আচরণ, খাওয়ার অভ্যাস, শ্বাসপ্রশ্বাস ও শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন খেয়াল করা জরুরি।
শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, বুক দেবে গেলে, খিঁচুনি হলে, ঠোঁট নীলচে হয়ে গেলে, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়লে কিংবা দুধ বা খাবার খেতে না পারলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বারবার বমি, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, পানিশূন্যতার লক্ষণ অথবা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর দেখা দিলেও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
তিন মাসের কম বয়সী শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা নিতে হবে। নবজাতকের শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলেও অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়।
সুস্থ শৈশব গড়তে সচেতনতাই মূল
শীতকালে শিশুর যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সঠিক পরিচর্যার বিকল্প নেই। উপযুক্ত পোশাক, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত টিকাদান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো চিকিৎসা শিশুকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন আলাদা। তাই শিশুর পরিচর্যায় সাধারণ নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি তার বিশেষ প্রয়োজনের প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত সচেতনতা ও উদ্যোগের মাধ্যমেই শিশুদের জন্য নিরাপদ, সুস্থ ও সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক:
বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চেয়ারম্যান, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সিলেট;
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিলেট ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল
