ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে এরই মধ্যে ঘরের একাংশ হারিয়েছেন খোদেজা আক্তার। হাতের ইশারায় দেখাচ্ছেন ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র। ফেনীর সোনাগাজীর চরদরবেশ ইউনিয়নের চর সাহাভিকারী গ্রাম । ছবি: খবরের কাগজ
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরদরবেশ ইউনিয়নের চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা খোদেজা আক্তার। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়ে ও চার ছেলেকে নিয়ে গত ৪০ বছর ধরে স্বামীর বাড়িতে বসবাস করছেন। নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছিল তার। সেই আতঙ্কই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি তার বসতঘরের একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় ঘরের চাল, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
তিনি জানান, যে ঘরে কেটেছে জীবনের দীর্ঘ সময়, যে উঠানে জমে ছিল সুখ-দুঃখের অসংখ্য স্মৃতি, সেই ঘরই এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। চোখের সামনে বসতভিটার মাটি ধসে পড়তে দেখে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
ফেনীর সোনাগাজীতে ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। নদীভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। গত দুই বছরে অন্তত ২৫টি বসতবাড়ি ও ১০০ একর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বসতভিটা ও জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে বহু পরিবারের। ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন
জানা গেছে, ছোট ফেনী নদী সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া, চরদরবেশ, চর মজলিশপুর ও বগাদানা ইউনিয়ন এবং দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ও জয়লস্কর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীভাঙনের কারণে এসব ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কোথাও ফসলি জমি, কোথাও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে নদীতীরের বাসিন্দাদের।
চরদরবেশ ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক মারুফ বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে সোনাগাজীর মানচিত্র পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বসতঘর হারাচ্ছে। মানুষের কষ্টের শেষ নেই। প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মোস্তফা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘অনেকের ঘরবাড়ি, জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নিচেও কোনো জায়গা নেই। আমরা কোথায় যাব? কার কাছে যাব?’
একই এলাকার বাসিন্দা শাহানাজ আক্তার বলেন, নদী একটু একটু করে নিতে নিতে সব জায়গা-জমি নিয়ে গেছে। এখন শুধু বসতবাড়ি আছে। সেটাও যদি চলে যায় পরিবার নিয়ে কোথায় যাব? কোনো চেয়ারম্যান-মেম্বার, এমপি-মন্ত্রী নেই আমাদের দিকে তাকানোর। কেউ যদি আমাদের দিকে তাকাতো, আমাদের বাড়ি ঘরগুলো রক্ষা হতো।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় মুছাপুর ক্লোজার ভেঙে যাওয়ার পর ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার-ভাটার পানি অবাধে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীতীরের ভাঙন বেড়েছে। গত দুই বছরে চর সাহাভিকারী গ্রামে অন্তত ২৫টি বসতবাড়ি ও ১০০ একর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতভিটা ও জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে অনেক পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। দিনের বেলায় চোখের সামনে নদীভাঙনের ক্ষতচিহ্ন আর রাতে ঘর হারানোর আতঙ্ক নিয়ে তাদের সময় কাটছে। দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। সোনাগাজী উপজেলায় এ প্রকল্পের আওতায় আমাদের দুটি প্যাকেজ রয়েছে। খুব শিগগিরই প্যাকেজ দুটির কাজ শুরু হবে। তখন ছোট ফেনী নদীর জোয়ার-ভাটার প্রভাবে সৃষ্ট ভাঙন থেকে মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ‘বর্তমানে নদীভাঙন বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কয়েকটি স্থানে ভাঙন রোধে অস্থায়ীভাবে কাজ চলছে। আটটি স্থানে এ ধরনের কাজ করা হচ্ছে। তবে এসব কাজ স্থায়ী সমাধান নয়। মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ করা হলে নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে। আমি আশা করি, রেগুলেটরটি পুনর্নির্মাণ হলে সোনাগাজী ও দাগনভূঞার মানুষ নদীভাঙনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন।’
জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন পাওয়া মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৫১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
