২০২৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন নাভি পিল্লাই। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নারী অধিকার কর্মী, আইনবিদ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক। কট্টর ইসরাইলবিরোধী নাভি পিল্লাই এর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পৃথিবীব্যাপী আলোচিত হয়েছে।
জসিম উদ্দিন মনছুরি
২০২৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন নাভি পিল্লাই। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নারী অধিকার কর্মী, আইনবিদ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক। কট্টর ইসরাইলবিরোধী নাভি পিল্লাই এর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পৃথিবীব্যাপী আলোচিত হয়েছে। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আজীবন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর নোবেল কমিটি কর্তৃক নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। তার এই কাজ ও ভূমিকার জন্য ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত ও প্রশংসা জানিয়েছেন। তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সাথে সাথে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আদালতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি যথার্থ হয়েছে।
তিনি বর্তমানে গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতের একজন অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও, তিনি জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারপার্সন, মাদ্রিদে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্তর্জাতিক কমিশনের সভাপতি, আন্তর্জাতিক নুরেমবার্গ নীতি একাডেমির উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি এবং কোরিয়ার গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রে আটক সংক্রান্ত আধা-বিচারিক তদন্তের চেয়ারপার্সন।
ফিলিস্তিন বিষয়ক আন্তর্জাতিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকান আইনবিদ নাভি পিল্লাই এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রধান অবদানগুলো হলো: জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের (Commission of Inquiry) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গাজায় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ নথিবদ্ধকরণে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ তুলে ধরে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সেখানে গণহত্যা চালানো হয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় হামলার তদন্তে ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক গাজার হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চালানো হামলা এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নিপীড়নের বিষয়টি তিনি সাহসিকতার সাথে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেন। তিনি বারবার জোর দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং অপরাধী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা ছাড়া এই সংঘাত ও সহিংসতার চক্র বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তার অবিস্মরণীয় ভূমিকা অন্যতম সাহসিকতার প্রকাশ। নাভি পিল্লাই সরাসরি কোনো একক “রায়” দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করেননি, বরং তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মামলা দায়ের করে গাম্বিয়া। নাভি পিল্লাই ২০১৯ সাল থেকে এই ঐতিহাসিক মামলাটিতে একজন অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নাভি পিল্লাইয়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অবদান: তাঁর দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ক্ষেত্রে কিছু যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। যেমন- ১. ধর্ষণকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দান: রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICTR) বিচারক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে (১৯৯৫-২০০৩) তিনি এক ঐতিহাসিক রায় দেন। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে তার ওই রায়ের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার শামিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২. বর্ণবাদবিরোধী আইনি লড়াই: দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের (অঢ়ধৎঃযবরফ) কালো অধ্যায়ে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বহু রাজনৈতিক বন্দি ও অধিকারকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে নিযুক্ত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক। ৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC): ২০০৩ সালে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে বেগবান করেন।
তাকে ম্যান্ডেলার রাষ্ট্রপতিত্বের সময় একটি পরিচিত নাম করে তোলে, এবং এভাবেই তিনি আদালতে মনোনয়নের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পান। নিয়োগের অল্প পরেই রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা নিজে ফোন করে পিল্লাইকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “তোমার নিয়োগ আমাকে অত্যন্ত ব্যক্তিগত আনন্দ দেয়। আমি আশা করি এটি শীঘ্রই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।” তবে উচ্চ আদালতে তার মেয়াদ বেশি দিন টেকেনি, কারণ শীঘ্রই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটিআর) বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করে।
তিনি ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম নেওয়া একজন ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত। দক্ষিণ আফ্রিকান মহিলা বিচারপতি। জাতিসংঘে তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (UN High Commissioner for Human Rights) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্ণবাদ অবসানের পর ১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা বিচারপতি নিযুক্ত হন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি ও সম্মাননা: ২০০৩ সালে, পিল্লাই প্রথম গ্রুবার নারী অধিকার পুরস্কার লাভ করেন। সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেছেন: ডারবান ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, নিউ ইয়র্ক সিটির সিটি ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ ল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স, যুক্তরাজ্য, রোডস বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ আফ্রিকা, লিউভেন ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেলজিয়াম, রটারডাম ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস। ২০০৯ সালে, ফোর্বস তাকে বিশ্বের ৬৪তম ক্ষমতাশালী নারী হিসেবে স্থান দেয়। ২০০৯ সালে, তিনি আমেরিকান একাডেমি অফ অ্যাচিভমেন্টের গোল্ডেন প্লেট পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৫ সালে, তিনি সিডনি শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। এবং ২০২৬ সালে, তিনি ওলোফ পাল্মে পুরস্কার জয় করেন। সর্বশেষ তিনি ২০২৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
এই কর্মবীর দুঃসাহসী নারীর নোবেল পুরস্কার তাঁর কর্মের স্বীকৃতির যথাযোগ্য মর্যাদা। পৃথিবীতে তাঁর আলোচিত কর্মগুলোই তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। বিশেষ করে তার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন, ফিলিস্তিনিদের ইসরাইল কর্তৃক নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান, রোহিঙ্গাদের পক্ষে ঐতিহাসিক ভূমিকা তাকে সাহসী বিচারক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে দেয়। তার এই নোবেল পুরস্কার তার কর্মের স্বীকৃতি ও উপযুক্ত মর্যাদা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। নোবেল কমিটি এবারের শান্তি পুরস্কারের মতো নিরপেক্ষভাবে যথোপযুক্ত ব্যক্তির হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে নিরপেক্ষতার ভূমিকা পালন করবে এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও এম.ফিল গবেষক-চ,বি।
