ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ধারায় মাত্র ১৪ বছর আগে রাজধানীর রমনা থানায় মামলা হয়েছিল, সেই তৌহিদ চৌধুরী এখন শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। পোশাক ব্র্যান্ডের আড়ালে তৌহিদ চৌধুরীর ছিনতাইকারী সিন্ডিকেট, হানি ট্র্যাপ চক্র পরিচালনা এবং খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের সাবেক এই আইনবিষয়ক সম্পাদকের বিরুদ্ধে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় জুলাই হত্যা মামলা থাকলেও কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, এই মর্মে দুদকসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ জমা পড়েছে।
তৌহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগপত্রে তাকে গ্রেপ্তার করে তার ছিনতাইকারী সিন্ডিকেট, জমি দখল, নির্যাতন, জালিয়াতি, শ্রমিক হত্যা ও দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তৌহিদ ঢাকায় ডাকাতি ও ছিনতাইকারী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এর ধারাবাহিকতায় রমনা মডেল থানায় ২০১২ সালে তার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩৯২ ধারায় মামলা (এফআইআর নং- ৩২, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১২) দায়ের হয়। তৌহিদ চৌধুরী খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সাবের উল হাইয়ের ডান হাত ছিলেন তৌহিদ। তার বিরুদ্ধে দখলবাজি ও শ্রমিক হত্যা মামলাসহ অনেক মামলা ছিল। টাকার জোরে বেশির ভাগ মামলা তিনি প্রভাবিত করেছেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা তৌহিদ চৌধুরী ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা (জিআর নং-১০৯) দায়ের করা হয়েছে। তবে টাকার জোরে সবকিছু ম্যানেজ করে এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ছিনতাইকারী সিন্ডিকেটসহ নানা অপকর্ম করে নিজের সাম্রাজ্য বহাল রেখেছেন।
তৌহিদের হানি ট্র্যাপ চক্র
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ছিনতাইকারী সিন্ডিকেটের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইজি ফ্যাশনের আড়ালে একটি হানি ট্র্যাপ চক্র গড়ে তোলেন তৌহিদ চৌধুরী। নিজ প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপনের নাম করে নারীদের প্রথমে মডেলিংয়ের প্রলোভন দেখানো হতো। পরবর্তীতে তাদের হানি ট্র্যাপ চক্রে জড়ানো হতো।
আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং দলীয় নেতাদের নারী সরবরাহের মাধ্যমে মনোরঞ্জন করাতেন তৌহিদ। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। এমনকি পরবর্তীতে হানি ট্র্যাপের শিকার ব্যক্তিদের টাকা বিদেশে পাচারের মাধ্যমে বড় অংশ নিজেই আত্মসাৎ করতেন।
জমি দখলের জন্য উত্তরাধিকার সনদ জালিয়াতি
২০১৮ সালে তৌহিদ ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে জমি দখলের উদ্দেশ্যে উত্তরাধিকার সনদ জালিয়াতি করে ভুয়া দলিল তৈরি করে জমি রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ ওঠে। ডাঙ্গা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন জানান, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেশের বাইরে থাকাকালে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সুযোগে তার সই জাল করে ইজি ফ্যাশনের কর্ণধাররা উত্তরাধিকার সনদ তৈরি করেন। এই জাল সনদ ও দলিলের মাধ্যমে তারা মোট ৪ বিঘা জমি আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ।
জালাল উদ্দিন বলেন, আমার সই জাল করেছে, এটা সত্য। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম, কিন্তু টাকার জোরে তারা মামলা থেকে খালাস পায়। আপিল করতে চেয়েও পারিনি। ওদের সঙ্গে পারা যায় না। ওদের টাকা আছে, ক্ষমতা আছে। এই জমি দখলের বিষয়টি জানার পর তদন্ত শুরু করেন এবং অনেকের জমি দখলের তথ্যও বেরিয়ে আসে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ভিরিন্দা, সান্তানপাড়া, রঘুনাথপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে তৌহিদ ও তার ভাইয়েরা অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষের জমি, বসতভিটা ও ফসলি জমি নানা কৌশলে দখলে নিয়েছেন। কারও জমির দলিলে স্বাক্ষর জাল করে, কারও মালিকানা দাবির নথি তৈরি করে, আবার কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন বলে অভিযোগ।
স্থানীয়রা জানান, তারা প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো মামলা খেয়ে হয়রানির শিকার হন।
একটি ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, সুরেন্দ্র চন্দ্র মিশ্রের সন্তান ললনা মিশ্রকে দাতা দেখিয়ে ১৬.৫ শতক জমি দখল করা হয়। একইভাবে নয়ন কুমার দাস, স্বর্দীপ চন্দ্র মিত্র, মৃণাল কান্তি মিশ্র, নব কৃষ্ণ মিত্র প্রমুখের নাম ব্যবহার করে ভুয়া দলিলে আরও শত শত শতক জমি দখল করেন তারা। প্রতিটি দলিলে ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে তৌহিদ চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
