ইউরোপে ডেনিম রফতানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডেনিম বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইউরোপের এই বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। যদিও আগস্টে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ফিরে এসেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ৮০ হাজার ইউরোতে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। ফলে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশও আগের বছরের আগস্টের তুলনায় বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউভুক্ত দেশগুলো মোট ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আমদানির মূল্য কমেছে ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে আগস্টে আমদানি বেড়ে ৪৩ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। টানা আট মাসের হিসাবের মধ্যে আগস্টের এই প্রবৃদ্ধি ইউরোপের বাজারে ডেনিমের চাহিদা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরছে।
ইইউর ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বছরের প্রথম আট মাসে দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। এ সময়ে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তান থেকে আমদানি হয়েছে ৫২ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ইউরো এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা তুরস্ক থেকে ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম।
শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও রপ্তানি আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এই পতন ইউরোপের সামগ্রিক ডেনিম আমদানি হ্রাসের হার ৪ দশমিক ৪০ শতাংশের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশ গত বছরের ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে। তবে আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাজারের গড় প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই মাসে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ হয়েছে, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মাসটিতে ইইউর ডেনিম আমদানিতে মোট যে অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৩৫ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বৃদ্ধির কারণে।
আগস্টের এই অগ্রগতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হারও কিছুটা কমেছে। জুলাই শেষে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম ছিল। আগস্টের প্রবৃদ্ধির পর আট মাস শেষে সেই পতন নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ, এক মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির অবনতি কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
ইইউর ডেনিম বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের অবস্থান দুর্বল হওয়ায় সামগ্রিক আমদানিতেও প্রভাব পড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তুরস্ক থেকে ডেনিম আমদানির মূল্য কমেছে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। ইউরোপের বাজারে ডেনিম আমদানি কমার ক্ষেত্রে তুরস্কের এই পতন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া মরক্কো থেকে আমদানি ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, পাকিস্তান থেকে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, কম্বোডিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং তিউনিসিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে কয়েকটি দেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এ সময়ে মিসর থেকে ডেনিম আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ইউরো। আর ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বৃদ্ধির হার ছিল ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। তুরস্কের সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ সেই সুযোগের পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। বরং মিসর, চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে নিজেদের সরবরাহ বাড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বাজারে অংশ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম দামের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নকশা ও উৎপাদনে নমনীয়তা এবং নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি দেশগুলো দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা পেতে পারে। তাই ইউরোপীয় ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারলে নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বাংলাদেশের।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউর ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য কমলেও শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে। আগস্টের প্রবৃদ্ধি বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখালেও প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখে বাজারে নিজেদের অংশ বাড়ানোই এখন বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানিকারকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
