
জালালাবাদ ডেস্ক: প্রায় ২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন ফিরছে বাণিজ্যিক উৎপাদনে। ফুটি কার্পাস তুলা শনাক্তকরণ, হাতে সূক্ষ্ম সুতা কাটা ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতে কাপড় বোনার প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর এবার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এ শিল্প ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫ জন উদ্যোক্তা উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের ক্রেতা-উদ্যোক্তারাও ঢাকাই মসলিনে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক মো. আইয়ুব আলী জানান, পাঠ্যবইয়ে পড়া বাঙালির ঐতিহ্য এখন নিজেরা তৈরি করতে পারছেন। শুধু মসলিন তৈরি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ গজ মসলিন নেওয়ার অনুরোধ এসেছে। উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিয়ম ও পদ্ধতিও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
একসময় বাংলার রাজদরবার ও অভিজাতদের পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত ঢাকাই মসলিন ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। সূক্ষ্ম বুনন ও মিহি সুতার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক কদর ছিল। নানা কারণে হারিয়ে যাওয়া এ শিল্প পুনরুদ্ধারে সরকারি উদ্যোগে ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু হয়।
গবেষণায় ফিরেছে ফুটি কার্পাস:
মসলিন পুনরুদ্ধারে ঐতিহাসিক নথি, গবেষণাপত্র ও জাদুঘরে সংরক্ষিত কাপড়ের নমুনা পর্যালোচনা করা হয়। প্রকল্পের মুখ্য গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মঞ্জুর হোসেন জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা ৩৯টি তুলার নমুনার মধ্যে ছয়টি জাত শনাক্ত করা হয়। পরীক্ষায় গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকার তুলার সঙ্গে ঐতিহাসিক মসলিনে ব্যবহৃত ফুটি কার্পাস তুলার ডিএনএর প্রায় ৯৬ শতাংশ মিল পাওয়া যায়।
তুলার জাত শনাক্তের পর গাজীপুরে তুলা বোর্ডের জমি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে তুলা চাষ করা হয়। এরপর হাতে সুতা কাটা, নাটাই করা, তাঁতে সুতা সাজানো এবং কাপড় বোনার পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।
তৈরি হচ্ছে কারিগর ও উদ্যোক্তা:
মসলিন উৎপাদনের জন্য কুমিল্লার চান্দিনায় খাদি কাপড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০০ জনের মধ্য থেকে ছয়জনকে বেছে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মসলিন হাউসে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৩০ জন তাঁতি ও কারিগরকে উৎপাদনে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
অধ্যাপক মঞ্জুর হোসেন জানান, বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য ফুটি কার্পাস তুলার সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তুলা চাষের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া এবং চুক্তিভিত্তিক তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে চাষি ও উৎপাদকদের মধ্যে সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সম্ভাবনা:
বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে তুলা চাষ, সুতা কাটা, কাপড় বোনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত তুলা, দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ২৭টি শাড়ি ও ২০টি স্কার্ফসহ বিভিন্ন ধরনের নমুনা কাপড় তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে তৈরি হয় আরও ৩১টি শাড়ি ও ১৪টি স্কার্ফ। এসব নমুনা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে।
বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্যও ঢাকাই মসলিন বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম সুতা ও কাপড় তৈরি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারমূল্য কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ উৎপাদনব্যবস্থার ওপর।
