চীনে গ্রেপ্তার এড়াতে মৃত যমজ ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে ১৯ বছর আত্মগোপনে ছিলেন ডাকাতির মামলার এক পলাতক আসামি। দীর্ঘদিন পর তার মৃত ভাইয়ের সাবেক প্রেমিকার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চেন পদবির ওই ব্যক্তি ২০০২ সালে একটি অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের খাতায় ওয়ান্টেড ছিলেন। অপরাধের ২৪ বছর পর গত জুনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশের ইউহুয়ানে অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সাত সন্দেহভাজন একজনকে অপহরণ করে তার কাছ থেকে নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করেন। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও চেন পালিয়ে যান।
পরে পুলিশ ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও তার কোনো সন্ধান পায়নি। একপর্যায়ে মামলাটি কার্যত অমীমাংসিত থেকে যায়। এর পাঁচ বছর পর, ২০০৭ সালে, মধ্য চীনের আনহুই প্রদেশ থেকে পুলিশ জানতে পারে, সড়ক দুর্ঘটনায় চেনের মৃত্যু হওয়ায় তার পারিবারিক নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। তাকে মৃত মনে করে পুলিশও মামলাটি বন্ধ করে দেয়।
তবে ঘটনার ১৯ বছর পর নিয়মিত নথি পর্যালোচনার সময় আনহুই থেকে পাওয়া একটি অস্বাভাবিক তথ্য পুলিশের নজরে আসে। সেখানে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে তার মৃত যমজ ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে বসবাস করছেন।
ইউহুয়ান পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা লং ইউওয়েন ২০০২ সালের ডাকাতির মামলার নথি আবার পর্যালোচনা করেন। সন্দেহভাজন চেন এবং ওই ব্যক্তির পরিচয়, আদি নিবাস ও পারিবারিক সম্পর্কের তথ্য মিলিয়ে তিনি বেশ কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পান। এরপর একটি বিশেষ তদন্ত দল আনহুইয়ে গিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
তদন্তে দেখা যায়, চেনের মা, বোন ও গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি ছিল, দুর্ঘটনায় চেনের ছোট যমজ ভাই মারা গেছেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ছিল উল্টো। মারা গিয়েছিলেন তার বড় যমজ ভাই, আর চেন সেই ভাইয়ের পরিচয় ধারণ করেছিলেন।
স্থানীয় পারিবারিক নিবন্ধন দপ্তর, ট্রাফিক পুলিশ ও শ্মশানের নথিতেও চেনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। এমনকি পুলিশ দুর্ঘটনার মূল নথিও সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় তদন্তকারীরা পুরোনো পরিচয়পত্রের ছবি পর্যালোচনা করেন। দুই ভাইয়ের চেহারায় মিল থাকলেও কিছু পার্থক্য ছিল। নথি ঘেঁটে পুলিশ জানতে পারে, ২০০৭ সালে চেনের মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের মাত্র নয় দিন পর তার বড় ভাইয়ের নামে পরিচয় পরিবর্তনের আবেদন করা হয়েছিল। সেই আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া নতুন ছবির মুখের গড়ন, অভিব্যক্তি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আগের ছবির স্পষ্ট অমিল ছিল।
চেনের ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা সহযোগিতা না করায় পুলিশ তার বড় ভাইয়ের সাবেক প্রেমিকা দেংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই নারীর সঙ্গে চেনের বড় ভাইয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার পর তিনি সম্পর্কটি শেষ করে দেন।
পুলিশ সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা ব্যাখ্যা করার পর দেং নিশ্চিত করেন, ১৯ বছর আগে দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন চেনের বড় ভাই, পলাতক চেন নন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ চেনকে গ্রেপ্তার করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় বদলে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর চেন নতুন নামে স্বাভাবিক ও শান্ত জীবনযাপন করছিলেন। তার ধারণা ছিল, এভাবে পরিচয় গোপন রাখার কৌশল কাজ করতে থাকবে। তবে চীনের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, এ অপরাধে তার তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ চেনের সাবেক প্রেমিকার ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, পলাতক আসামিকে আড়াল করার অভিযোগে তার মা ও বোনের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
/অ
