ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ১০টা। শহরের থানাপাড়ায় ধীরে ধীরে নেমে আসছে নীরবতা। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের পুকুরপাড়ে ঝিঁঝিপোকার ডাক। রাসেল মিয়ার দোকানের সামনে এসে থামল একটি রিকশা। রিকশা থেকে নামলেন যাত্রী। ভাড়া পরিশোধের জন্য মানিব্যাগ বের করতেই রিকশাচালক শফিকুল ইসলাম জানতে চাইলেন, ‘ভাই, সোমবার কি সরকারি ছুটি আছে?’
যাত্রী জানালেন, পূজার ছুটি আছে। এই কথা শুনেই লাল টুকটুকে পান খাওয়া মুখে একগাল হাসি ফুটে উঠল শফিকুলের। যেন বুকের ওপর থেকে নেমে গেল দুশ্চিন্তার ভার। হাসিমুখে বললেন, ‘সত্যিই যেন সোমবার ছুটি থাকে ভাই। খবরটা শুনে খুব শান্তি লাগল ভাই।’
মাত্র কয়েক মিনিটের কথোপকথনেই বোঝা গেল, একজন রিকশাচালকের কাছে সরকারি ছুটির খবর কতটা স্বস্তির হতে পারে। অন্যের কাছে ছুটি মানে বিশ্রাম কিংবা অবসর। কিন্তু শফিকুলের কাছে ছুটি মানে অন্তত এক দিনের জন্য কিস্তির দুশ্চিন্তা থেকে একটু মুক্তি।
গাইবান্ধা শহরের অদূরে সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের কনকরা গ্রামে তাঁর বাড়ি। পেশায় রিকশাচালক শফিকুলের জীবন চলে চাকা ঘুরিয়ে। তবে সেই চাকার সঙ্গে ঘুরতে থাকে ঋণের কিস্তি, সংসারের খরচ আর স্ত্রী-সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দেওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম।
সপ্তাহে দুই দিন কিস্তির টাকা জোগাড়ের লড়াই
শফিকুলের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো মানসিক চাপ তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। সেই চাপের অন্যতম কারণ ঋণের কিস্তি। সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বুধবার তাঁকে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হয়। দুই সমিতি মিলিয়ে প্রতি সপ্তাহে গুনে গুনে দিতে হয় ২ হাজার ৯০০ টাকা।
আশা সমিতি থেকে ৭০ হাজার টাকা এবং বীজ সমিতি থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। আশা সমিতির ২৫টি কিস্তি পরিশোধ করেছেন। আর বীজ সমিতির কিস্তি দিয়েছেন পাঁচ-ছয়টি।
ঋণের টাকা দিয়ে বোনের বিয়ে দিয়েছেন। বসতভিটার জন্য দুই শতক জমি কিনেছেন। তৈরি করেছেন একটি ঘর, কিনেছেন একটি গরুও। জীবনের প্রয়োজন মেটাতে নেওয়া সেই ঋণ এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সপ্তাহের প্রতি সোমবার আশা সমিতিতে দিতে হয় ১ হাজার ৮৫০ টাকা। বুধবার বীজ সমিতিতে দিতে হয় আরও ১ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের শুরুতেই একটি বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করার চিন্তা, এরপর বুধবার আবার নতুন করে কিস্তির তাগাদা।
শফিকুলের ভাষায়, কিস্তির টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীর মুখে ভালো খাবার তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের প্রয়োজন আর ঋণের দায়—দুটোর মধ্যে প্রতিনিয়ত হিসাব মেলাতে হয় তাঁকে।
সারাদিন রিকশা চালিয়েও মেলে না স্বস্তি
আগের মতো রোজগার নেই শফিকুলের। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রিকশা চালান। এরপর কিছুটা বিরতি দিয়ে বিকেল ৪টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আবার রাস্তায় নামেন। দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে প্রতিদিন তাঁর আয় হয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
এই আয় থেকেই চালাতে হয় পাঁচ সদস্যের সংসার। খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, ঘরের অন্যান্য খরচ—সবকিছু সামলে কিস্তির টাকা পরিশোধ করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিস্তির টাকা জোগাড় করতে কখনো নিজের খাবারেও টান দিতে হয়। পরিবারের জন্য ভালো খাবার কেনার ইচ্ছা থাকলেও সবার আগে ভাবতে হয় ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন।
ইলিশ মাছ কিংবা গরুর মাংস তাঁর কাছে যেন বিলাসিতার নাম। বছরে দুই ঈদে মাংস রান্না হয় বাড়িতে। ইলিশ মাছ খাওয়ার কথা জানতে চাইলে বিদ্রূপের হাসি দিয়ে শফিকুল বলেন, ‘কিস্তির টাকা দিমো, না ইলিশ মাছ কিনমো! যখন হাঁস-মুরগির ব্যারাম আসে, তখন জবাই করি খাই।’
কথাটি বলার সময় তাঁর হাসিতে যেমন রসিকতা ছিল, তেমনি ছিল অভাবের নির্মম বাস্তবতা। যে মানুষটি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় রিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন, তাঁর কাছে পছন্দের খাবার কেনার সিদ্ধান্তও হয়ে দাঁড়ায় হিসাব-নিকাশের বিষয়।
শফিকুলের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেটি শিশু শ্রেণিতে পড়ে, আর এক মেয়ে পড়ে প্রথম শ্রেণিতে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে তাঁর স্বপ্ন আছে, আছে তাদের ভালোভাবে বড় করে তোলার প্রত্যাশা। কিন্তু সীমিত আয়ের সংসারে সেই স্বপ্ন পূরণ করাও সহজ নয়।
একদিকে সন্তানদের খাবার ও পড়াশোনার খরচ, অন্যদিকে প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত দিনে কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা। আয় কম হলে কিংবা কোনো দিন রিকশা চালিয়ে প্রত্যাশামতো টাকা না উঠলে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে।
শফিকুলের কথায়, এক সপ্তাহের জন্যও কিস্তি মাফ নেই। ফলে শরীর খারাপ হোক কিংবা রোজগার কম হোক, নির্ধারিত দিনে টাকা জোগাড় করতেই হয়।
রাতের সেই কয়েক মিনিটের কথোপকথনে শফিকুলের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সোমবারের সরকারি ছুটির খবর। কারণ, সোমবারই তাঁকে আশা সমিতির ১ হাজার ৮৫০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। ছুটির খবরে অন্তত কিস্তির চিন্তাটা সাময়িকভাবে মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে পেরেছেন তিনি।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঘড়ির দিকে নয়, জীবিকার তাগিদেই যেন তাঁর মন পড়ে রইল রাস্তায়। যাত্রী নিয়ে যেতে হবে, রিকশা চালাতে হবে, আয় করতে হবে। কারণ, পরবর্তী কিস্তির টাকা তো জোগাড় করতেই হবে।
বিদায় নেওয়ার আগে শফিকুল বললেন, ‘সোমবার সরকারি ছুটি, তাই কিস্তির চিন্তাটা মাথা থেকে সরে গেল ভাই। থাকেন, কয়েকটা টাকা কামাই করি।’
কথা শেষ করেই রিকশার হ্যান্ডেল ধরে যাত্রীর উদ্দেশে রওনা হলেন তিনি।
রাত তখন আরও গভীর হচ্ছে। শহরের রাস্তায় নীরবতা বাড়ছে। কিন্তু শফিকুলের বিশ্রামের সুযোগ নেই। তাঁর রিকশার চাকা যতক্ষণ ঘুরবে, ততক্ষণই কিছু টাকা জমবে সংসারের জন্য, কিস্তি পরিশোধের জন্য।
একজন শ্রমজীবী মানুষের কাছে ছুটির খবর শুনে এমন স্বস্তি পাওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। শফিকুলের মতো মানুষেরা প্রতিদিন পরিশ্রম করে সংসার টিকিয়ে রাখেন। তাঁদের কাছে সামান্য অবকাশও অনেক বড় প্রাপ্তি। আর সেই অবকাশের আনন্দের আড়ালে থেকে যায় একটাই প্রশ্ন—সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরও কেন তাঁদের জীবনে স্বস্তির জায়গাটুকু এত সীমিত?
শফিকুলের সেই কথাটি তাই শুধু একজন রিকশাচালকের অনুভূতি নয়—এটি ঋণের কিস্তি, সীমিত আয় আর নিত্যদিনের টানাপোড়েনে আটকে থাকা অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের জীবনেরও এক প্রতিচ্ছবি।
