সৌদির বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের, প্রতিহতের দাবি জোটের
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবিও করেছে গোষ্ঠীটি। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সাম্প্রতিক এসব হামলার পর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতে হুতিদের ভূমিকা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
হুতিরা একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৯০-এর দশকে দেশটির উত্তরাঞ্চলে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। একসময় ইয়েমেন শাসন করা এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ পরে দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক প্রান্তিকতার শিকার হন।
২০১১ সালের আরব বসন্তের বিক্ষোভে ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করে হুতিরা। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে তারা। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়।

হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নাম থেকে গোষ্ঠীটির ‘হুতি’ পরিচিতি এসেছে। বর্তমানে এর নেতৃত্বে রয়েছেন আবদুল মালিক আল-হুতি।
ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন সৌদি আরব ২০১৫ সালের শুরুতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। গোষ্ঠীটিকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করাই ছিল এ অভিযানের লক্ষ্য।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযানের পর ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এতে দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জোটের সদস্যরা ব্যাপক বিমান হামলা চালালেও হুতিদের পুরোপুরি পরাস্ত করতে পারেনি। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে গোষ্ঠীটি।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে চলতি বছর আবার সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুতিরা। একই সঙ্গে ইসরায়েল লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এ বছর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবে হামলা আবার বাড়ায় হুতিরা। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করায় সৌদি আরবকে লোহিত সাগরের বন্দর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে আরও বেশি তেল রপ্তানি করতে হচ্ছে।
এতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ ও মোখা বন্দরনগরী দখল করে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা এ পদক্ষেপ নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। হুতিদের অবরোধের কারণে লোহিত সাগরের পথে বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের চাপ বাড়ছে।
ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ এ অঞ্চলে বসবাস করে। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে গোষ্ঠীটির সশস্ত্র সদস্যসংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ বলে অনুমান করা হয়েছিল।
তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

ইরান হুতিদের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে সমর্থন দেয়। এ জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও রয়েছে। তবে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর সম্পর্কের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে। এ ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহও ভূমিকা রাখছে বলে দাবি ওয়াশিংটনের। তবে হুতিরা নিজেদের ইরানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের দাবি, নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে তারা।
দুর্গম পাহাড় ও বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে অবস্থানের কারণে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো কঠিন। তাদের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েও গোষ্ঠীটিকে পুরোপুরি দমন করা যায়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে তারা। তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে প্যালেস্টাইন-২ মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার হাইপারসনিক সক্ষমতা আছে বলে দাবি করা হয়। তুফান ক্ষেপণাস্ত্রকে ইরানের ঘদর ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তিত সংস্করণ বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া বুরকান ও বদর সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যেগুলোর উৎস ইরান বলে ধারণা করা হয়।
সৌদি আরবের মতো সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা হুতিদের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করেছে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
