আধুনিক বাংলা কবিতার অনন্য রূপকার শামসুর রাহমান জীবন ও সমাজকে অবলোকন করেছেন গভীর নিবিড়তায়। নগরকৈশোর, নাগরিক টানাপোড়েন এবং স্বজাতীয় বোধের যে বিপুল বিস্ফোরণ তার কবিতাকে বিশিষ্টতা দান করেছে, এর ভিন্নতর ও সূক্ষ্ম মানস-প্রকাশ ঘটেছে তার উপন্যাসে। কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও নমস্য হলেও, শামসুর রাহমানের উপন্যাসগুলো তার মানস-চেতনালোকের নতুন দরজা উন্মোচন করে। তবে এই কথাটি অনস্বীকার্য যে তার কথাসাহিত্য তার কাব্য-পরিসরের বিরোধী নয়; বরং তার কাব্যিক সংবেদনশীলতারই বিশেষ গদ্যময় সম্প্রসারণ। একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক হিসেবে সমাজের অনাচার, রাজনৈতিক সংক্ষোভ ও মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্দাহকে অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি। ফলে তার চারখানি উপন্যাসেÑ ‘অক্টোপাস’ (১৯৮৩), ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ (১৯৮৫), ‘নিয়ত মন্তাজ’ (১৯৮৫) ও ‘এলো সে অবেলায়’ (১৯৯৪)Ñ ব্যক্তিগত, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শনের গভীর সংমিশ্রণ ঘটেছে।
শামসুর রাহমানের প্রথম উপন্যাস ‘অক্টোপাস’ একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপকধর্মী সৃষ্টি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অস্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা ও নগরকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক সংকট এই উপন্যাসের মুখ্য উপজীব্য। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রথিতযশা সাহিত্যিক ইশতিয়াক হোসেনের আত্মকথন ও আত্মোপলব্ধির ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে আধুনিক নাগরিক মধ্যবিত্তের অন্তর্দাহ, পলায়নপ্রবৃত্তি ও নানাবিধ অসংগতি। ইশতিয়াকের দাম্পত্যসংকট, পরকীয়া ও প্রেমচিন্তার আড়ালে মূলত ক্রিয়াশীল থাকে একধরনের অস্ফুট শূন্যতাবোধ ও সমাজবিচ্ছিন্নতা। সাহিত্য সাধনাকে জীবিকার অবলম্বন করতে না পারার গ্লানি এবং সীমিত আয়ের চাকরিজীবনের বাধ্যবাধকতা তাকে এক প্রকার বন্ধনদশার দিকে ঠেলে দেয়। এমনকি নিজ স্ত্রী ইয়াসমিনের সন্তান গ্রহণের প্রকৃতিপ্রদত্ত ইচ্ছাকে সে যুক্তিযুক্ত মনে করে না; বরং সন্তান লালন-পালনকে এক অতিরিক্ত ঝঞ্ঝাট ভেবে নিয়মিত গর্ভনিরোধক ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শামসুর রাহমান ইশতিয়াকের এই বিচ্ছিন্নতাকে কেবল একক ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেননি। উপন্যাসে ‘অক্টোপাস’ কেবল একটি চরিত্র বা ব্যক্তির মানসিক অস্থিরতা নয়; বরং তা সমগ্র ঢাকা শহর তথা এক অস্থিতিশীল সমাজদেহে তার আটটি বাহু প্রসারিত করে রেখেছে। বহিরাগত সামাজিক অবক্ষয় ও অন্তর্জগতের অমোঘ দ্বন্দ্বের মুখে দাঁড়িয়ে কীভাবে এক বিকাশমান জাতির স্বপ্ন অক্টোপাসের জালে বন্দি হয়ে পড়ে, তারই নিপুণ বয়ান ধরা পড়েছে এই উপন্যাসে।
অন্যদিকে, ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ মূলত কবির আত্ম-জৈবনিক উপাদানসমৃদ্ধ এক সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উপন্যাস। জীবিকাসূত্রে সাংবাদিক নাদিমের স্মৃতি রোমন্থন ও মানস-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শামসুর রাহমান এখানে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতম সময়কে তুলে ধরেছেন। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতার লাইনকে শিরোনাম করে রচিত এই উপন্যাসে সময়ের বিরূপতা ও রক্তক্ষরণ গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে। পঁচিশে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদারদের অতর্কিত বর্বরতায় যখন নগর ঢাকা থমকে দাঁড়ায়, তখন নাদিম তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শিকড়ের টানে ছুটে যায় শৈশবের গ্রাম পলাশতলীতে। গ্রামীণ পরিবেশের কোলে আশ্রয় নিয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নাদিমের স্মৃতিপটে একের পর এক ভেসে ওঠে অতীত জীবনÑ কৈশোরের দিনগুলো, বাবার শাসন, আর প্রথম প্রণয়িনী সামিনার নিশ্বাসের উষ্ণতা। তার স্মৃতির আকাশে উঁকি দেয় প্রেয়সী শাকিলা আহমদের কথা, যাকে ভালোবেসে নাদিম কবিতার জোয়ার ভাসিয়েছিল এবং যার কারণে তার এমএ পরীক্ষাও মিস হয়েছিল। অথচ নিরেট বাস্তববাদী শাকিলা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় কেবল একটি চিঠি লিখে তাকে পরিত্যাগ করেছিল। পরে স্ত্রী নাজমাকে নিয়ে সংসার করার সময়েও তন্বী তরুণী রুমানার অবয়বে সে খুঁজে পেয়েছিল শাকিলারই প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ ও শঙ্কিত পটভূমিতে স্মৃতি ও বাস্তবের এই টানাপোড়েন উপন্যাসটিকে এক জটিল ও গভীর মানসিক মাত্রা দান করেছে।
শামসুর রাহমানের গদ্যরীতির আরেকটি অনবদ্য দৃষ্টান্ত ‘নিয়ত মন্তাজ’। এটি মূলত সাংবাদিক নাসিম তারেকের জীবনের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের জাল দিয়ে বোনা এক নাগরিক আখ্যান। নাসিম পেশাগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ একজন সংবাদকর্মী, যার দূরদর্শী প্রতিবেদন সাংবাদিক মহলে বেশ আদৃত। তবে তার অবচেতনে বসবাস করে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। সে স্বপ্ন দেখে সে এক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, কিংবা মহল্লার ফুটবল প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলদাতা, অথবা ছায়ানটের মঞ্চে আকস্মিক সুযোগ পেয়ে সাড়াজাগানো কোনো পরিবেশক। কিন্তু পরক্ষণেই অতি-বাস্তবের আঘাতে তার স্বপ্নজগৎ কাচের মতো গুঁড়ো হয়ে যায়। সে আবিষ্কার করে, সে কেবল ‘সাপ্তাহিক অলকানন্দ’ পত্রিকার কার্যালয়ে নিজের চেয়ারে বসে থাকা এক সাধারণ চাকরিজীবী। মধ্যবিত্ত মানসের এই প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির মধ্যকার দীর্ঘশ্বাস এবং কল্পনার ফানুস ফেটে বাস্তবের কঠিন মাটিতে আছড়ে পড়ার এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে নাসিম তারেকের অবয়বে।
