ঢাকার সাভারের বিরুলিয়া কালিয়াকৈরের আলোচিত তোহফাতুল জান্নাত মহিলা মাদরাসা'য় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম।
আজ রোববার সকাল ১০টায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) কো-চেয়ারম্যান আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমানের নেতৃত্বে শীর্ষ নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে নেতারা ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মাদ্রাসার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানান।
পরিদর্শন শেষে এক ব্রিফিংয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হেফাজত মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসাটির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নারকীয় তাণ্ডবের বাস্তব চিত্র দেখতে এবং তা গণমাধ্যম ও প্রশাসনের সামনে তুলে ধরতেই আমরা এখানে এসেছি। শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচালকের বাসস্থানের আসবাবপত্র তছনছ করাসহ প্রতিষ্ঠানটির দরজা, জানালা, লাইট, ফ্যান, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিংমেশিন ওয়াশরুমের ঝরনা, কল এবং ইলেকট্রিক লাইনের সব তারসহ ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের চিত্র আমরা দেখেছি। এতে কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আইনি পন্থা।’
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান, মাল ও সম্মানের মর্যাদা অনেক বেশি। তাই কারও মানহানি বা সম্মানহানি হয়—এমন আচরণ ও মন্তব্য থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। আমরা এসব ঘটনাকে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ বলে মনে করছি। সরকারকে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ সময় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা আব্দুল বারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যায় বা দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন মানুষকে অপরাধী হিসেবে সমাজের সামনে চিত্রায়িত করা কোনো নিয়ম হতে পারে না—এই প্রশ্ন আমি সরকারসহ গোটা জাতির বিবেকের কাছে রাখতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্যায়কারীর অন্যায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হলে তার যথোপযুক্ত শাস্তির জন্য আমরা উদ্যোগী হয়ে ভূমিকা পালন করব। এ দেশে ইসলামী আইনের শাস্তি হয় না, আমরা দাবি করব এই ক্ষেত্রে ইসলামী আইনের কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা হোক।’
কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, আলেম-উলামা ও মুরুব্বিদের অবহিত করা যেত অথবা স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মাদ্রাসাটিতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে।’
শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত আসবাবপত্রসহ পরিচালক দম্পতির ব্যক্তিগত অর্থকড়ি ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কোনো ব্যক্তি অন্যায়কারী বা অপরাধী হন, তাহলে তার অপরাধের কারণে প্রতিষ্ঠানের কী অপরাধ?’ তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কখনোই কোনো অন্যায়কারীর পক্ষাবলম্বন করি না। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বিচার হোক—তাতে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করব। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে পুরো একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা ও লুটপাট চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো অভিযোগ থাকলে তা শিক্ষাবোর্ড বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়ে সমাধানের সুযোগ ছিল।’
এ সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের নিরপরাধ স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই নিরপরাধ দ্বীনদার মহিলাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।’
সাম্প্রতিক ‘মব কালচার’ ও মাদ্রাসার ওপর আঘাত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে এক ধরনের ‘মব’ সৃষ্টির অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই মব কালচারের বিরুদ্ধে দেশের সব নাগরিককে সচেতন হতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে জনমত গড়ে তুলতে হবে। মানুষের জানমাল ও ইজ্জত রক্ষায় সরকারকেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে মানুষকে বিমুখ করার জন্য এটি কিছু চক্রের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। দ্বীনি ও ধর্মীয় শিক্ষাকে স্তব্ধ করা এবং মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভক্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হচ্ছে। দেশি-বিদেশি খোদাদ্রোহী ও নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এসব অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।’
সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করে সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হলেও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। সাভার থানা যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হতো, তবে তারা পাশের আশুলিয়া বা উত্তরা থানার সহযোগিতা নিতে পারত। কিন্তু তাদের সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট। এই নৈরাজ্য ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় সরকারকে নিতে হবে এবং মাদ্রাসার যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’
পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন—হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা নাজমুল হাসান, ঢাকা জেলা উত্তরের উপদেষ্টা মাওলানা আশিকুর রহমান, মাওলানা আব্দুল্লাহ, মাওলানা আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ, ঢাকা জেলা উত্তরের সভাপতি মাওলানা আলী আকবার কাসেমী, সেক্রেটারি মাওলানা আলী আজম, মুফতী মাহফুজুর রহমান, মাওলানা ফয়সাল মাহমুদ হাবিবী, মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাসেমী, মাওলানা নাজমুল হাসান বিন নূরী, মাওলানা আহমাদ আল হাবিব, মাওলানা আলী আকরাম, মাওলানা আব্দুল্লাহ ফিরোজী, মাওলানা ফয়জুল্লাহ আজমীসহ মহানগর ও স্থানীয় উলামায়ে কেরাম।
