Published on
:
2 min read
বাবলু সাঁতরা চন্দ্রকোণা
ওঁরা রাধেন, চুলও বাঁধেন। আবার পুজো এলে ঢাকে দুই কাঠিতে আগমনীর বোলও তোলেন। সংসারের জোয়াল টানতে পরিবারের পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিনমজুরি করেন। কিন্তু বাতাসে পুজোর গন্ধ লাগলে কাজের ফাঁকে ঢাকে নতুন বোল তোলার চর্চা শুরু হয়ে যায় ওঁদের। অপেক্ষা শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজোর। সাংসারে দুটো পয়সা বাড়তি আসার সঙ্গে দুগ্গামাকে নিজেদের বাজনা শোনানোর ইচ্ছেটাও থাকে মনের কোণে। আশপাশের গ্রাম থেকে মফস্বল শহর, সেখান থেকে কলকাতা––লক্ষ্মী, আরতি, পুতুল, কেশরীর ঢাকের বোলে মেতেছে অনেক পুজোমণ্ডপ।
বেশ কয়েক বছর হলো লক্ষ্মী, আরতিদের ঢাকের বোলে মেতেছে ভিন রাজ্যের বিভিন্ন পুজোর মণ্ডপ। পুজো এলেই ঢাক নিয়ে তাঁরা পাড়ি দেন ভিন রাজ্যে। এ বারও বৃহস্পতিবার, পঞ্চমীতে ওড়িশায় রওনা দিয়েছেন চন্দ্রকোণার টুকুরিয়া গ্রামের লক্ষ্মী মান্ডি, আরতি ঘোষ, পুতুল সরেন, কেশরী মান্ডি। এঁদের অধিকাংশই বিবাহিত। সংসার সামলানোর ফাঁকেই তালিম নিয়েছিলেন ঢাক বাজানোর। আজ মহিলা ঢাকশিল্পী হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে খ্যাতি। এ বছর পুজোয় ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার বাদামপাহাড় থেকে বায়না এসেছে লক্ষ্মীদের। বৃহস্পতিবার ব্যাগপত্র গুছিয়ে ঢাক নিয়ে চন্দ্রকোণা সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডে হাজির হয়ে গিয়েছিলেন লক্ষ্মী, আরতিরা। সেখান থেকে বাসে খড়গপুর রেলস্টেশন। তারপরে ট্রেনে ওড়িশায়। ষষ্ঠী থেকে দশমী এই পাঁচদিন ওড়িশার বাদামপাহাড়ে পুজোয় ঢাকে বোল তুলবেন লক্ষ্মী, আরতিরা। তাঁদের কথায়, ‘দিনমজুরি করে সংসার চলে। ঢাক বাজিয়ে যে টাকা পাওয়া যায় তাতে সংসারটা আরও কয়েকটা দিন ভালোমতো চলে যায়। চুক্তির বাইরে বকসিস হিসাবেও অতিরিক্ত টাকা কিছু মেলে। মাথাপিছু এক একজন কুড়ি হাজার টাকার মতো পাই।’ একটু থেমে ফের আরতিরা বলেন, ‘পুজোর কয়েকটা দিন তো ঘরে থাকতে পারি না। তাই ফেরার সময়ে ঘরের লোকদের জন্য কিছু কেনাকাটা করে আনি। আমাদের পুজোর আনন্দ বলতে এটুকুই।’
বেশ কয়েক বছর ধরে মহিলা ঢাকি দলের ম্যানেজারের ভূমিকা পালন করে চলেছেন গ্রামের রণজিৎ বাগ। তিনিই গ্রামের মহিলাদের ঢাক বাজানোর তালিম দেন। ভিনরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পুজোর বায়না ধরেন। রণজিৎ বলেন, ‘পুজোর সময়ে ঘর, পরিবার ছেড়ে বাইরে কাটাতে কার ভালো লাগে? কিন্তু কী করা যাবে! অনেকেরই আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ঢাক বাজানোর প্রতি আগ্রহ দেখানোয় আট– দশ বছর আগে ওঁদের নিয়ে মহিলাদের ঢাকির দল তৈরি করি। স্থানীয় বিভিন্ন পুজো কমিটিও ওঁদের নিয়ে যায়। কোনও কোনও বছর অন্য রাজ্যেও পুজো কেটেছে। দিল্লি, মুম্বই, রাঁচিও গিয়েছি ওঁদের নিয়ে। এ বার যাচ্ছি ওড়িশায়।’
