শেষ কিছুদিনে একটা বিষয় পানির মতো পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইউক্রেন। তবে সেটা কতটা, তা একের পর এক ইউক্রেনের খারাপ খবরই প্রমাণ করে দিচ্ছে। আরেকটা প্রশ্নও সামনে দাড় করিয়ে দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে মহাশক্তিশালী রাশিয়ার সামনে কতদিন টিকে থাকবে এই ইউক্রেন?
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। একই সঙ্গে সামরিক সহায়তা ও ইন্টারনেট নিয়ে অনিশ্চয়তায় দেশটির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় ব্যর্থতার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দোষারোপ করেছেন ট্রাম্প। আবার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা আটকে রাখার অভিযোগ তুলেছে কিয়েভ। এদিকে রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমে যাওয়ার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ইউক্রেনে।
২০২৫ সালের শুরুতে ক্ষমতায় ফিরে ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা প্যাকেজ বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এরপর ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তার বড় অংশের দায়িত্ব নেয়। পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাও বাড়িয়েছে ইউক্রেন। তবে মার্কিন প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের বিকল্প এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে অন্তত ১৩ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে দিয়েছে অন্তত ২২ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার।
ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্র কিনে ইউক্রেনকে সরবরাহ করলেও এসব অস্ত্র হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পেন্টাগনের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে অস্ত্র সরবরাহের ওপরও ওয়াশিংটনের প্রভাব রয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপনাস্ত্রের সংকট
ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম এই অস্ত্রের সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ায় রাশিয়ার হামলার মুখে ইউক্রেন আরও ঝুঁকিতে পড়েছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগে সরবরাহের বিষয়ে সম্মতি পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনো ইউক্রেনে পৌঁছায়নি। গত সপ্তাহে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার পর কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ, এসব অস্ত্রের অর্ডার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্যও লাভজনক।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্টারলিংকেও নির্ভরতা
অর্থনৈতিক সহায়তা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা রয়ে গেছে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দেশটির সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ প্রযুক্তি এবং ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ড।
ইউক্রেনের অভিযোগ, কয়েক দফায় রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। এতে হামলার আগে সতর্কসংকেত দেওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা। তবে ট্রাম্প ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পরে জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আবারও স্বাভাবিক হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, স্টারশিল্ড ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্টারলিংক ব্যবহারে বিধিনিষেধের কারণে ইউক্রেনের ড্রোন অভিযান ও সম্মুখযুদ্ধের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল বলে দাবি করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। মাস্ক অভিযোগ করেছেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী মানুষ হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলায় স্টারলিংকের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রযুক্তি ও সামরিক ব্যবস্থায় নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে স্বল্পমেয়াদে ইউক্রেন বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কের অবনতির প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন কিয়েভের ওপর চাপ বাড়ালে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি আশাবাদী হয়ে উঠতে পারে।
চলতি মাসে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে তা স্থগিত করা এবং দেশটিকে ডিজেল রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। অন্যদিকে, যুদ্ধ বন্ধে নিজেদের কঠোর দাবিগুলো থেকে সরে আসেনি মস্কো।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক নাতিয়া সেস্কুরিয়ার মতে, ইউক্রেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রাশিয়াকে এমন ধারণা দিতে পারে যে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে গেলে একসময় ইউরোপের সমর্থনও দুর্বল হয়ে পড়বে।
নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের জন লফের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট করছে। এতে ইউক্রেনের পক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
মোদ্দাকথা, ইউরোপের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা ইউক্রেনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করলেও মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তির তাৎক্ষণিক বিকল্প তৈরি করা কঠিন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ঐক্য—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। যা ইউক্রেনের জন্য টিকে থাকার কঠিন এক প্রশ্ন।