আর্থিক সংকটে ধুঁকতে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ শতাংশ সুদে ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে তিন মাসের জন্য এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরুর পর গত তিন দিনে ব্যাংকটিতে আমানত ফেরতের আবেদন জমা পড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ অক্টোবর থেকে ১ লাখ টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা ফেরতের আবেদন নেওয়া শুরু করে ন্যাশনাল ব্যাংক। এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন বলেন, ‘আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে প্রতিটি শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ করা হবে। আমরা ১ লাখ টাকার বেশি আমানত থাকা গ্রাহকদের আবেদন নিচ্ছি, যাতে তাদের অর্থের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরবে। কারণ, গ্রাহকেরা দেখতে চান ব্যাংক তাদের টাকা দিতে পারছে কি না।’ আবেদন জমার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘তিন দিনে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। অনেক গ্রাহক যখন তাদের আমানতের সুদ পাবেন, তখন তারা আমানত এই ব্যাংকেই রাখবেন। আমি আশা করছি, গ্রাহকেরা আমানতের মেয়াদপূর্তির আগেই টাকা তুলে নেবেন না।’
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, ন্যাশনাল ব্যাংককে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নিতে গিয়ে ব্যাংকটি কোনো সংকটে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা দেবে বলে গভর্নর আশ্বাস দিয়েছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্যারান্টির শর্ত হিসেবে তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে ওই অর্থ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অর্থায়নের বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বলেন, ‘ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে সোনালী ব্যাংক শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিয়েছে। মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে ওই অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে এই অর্থায়নে সোনালী ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই। এর আগেও ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অর্থ দেওয়া হয়েছিল।’
সংকটের নেপথ্যে অনিয়ম ও লুটপাট : একসময় দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে বড় পরিবর্তন আসে এবং পরবর্তীতে এর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সিকদার পরিবারের হাতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে ফের পরিবর্তন আনা হয়। তবে সিকদার পরিবারের সময়কার অনিয়ম ও লুটপাটের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি।
উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক সূচকগুলো চরম দুর্বল হয়ে পড়েছে। টানা লোকসানের পাশাপাশি আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ধারাবাহিক লোকসানে থাকা ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে ইতিপূর্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এর পরও স্বাভাবিক লেনদেন পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের চারজন আমানতকারী জমা টাকা তুলতে না পেরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। শুনানি শেষে তাদের সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা উত্তোলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের নির্দেশ ও গভর্নর-চেয়ারম্যান বৈঠক : এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক। সাক্ষাৎকালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গভর্নর ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা উত্তোলনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন। তিনি আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। একই সঙ্গে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব আমানতকারী যাতে চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আগের দেনা : এর আগেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে নির্ধারিত সময়ে ওই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককেই সেই দায় মেটাতে হয়, যা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ হিসেবে দায় তৈরি করে। বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এই অর্থের পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা ছাপিয়ে দিয়েছে।
