‘পইড়া মাথা ফাটবো, সাবধানে, সাবধানে’, ‘বাচ্চাটাকে ধরে ধরে নেন, পড়ে যায় না যেন’–এমন নানা সতর্কবার্তায় একে অপরকে সাবধান করছিলেন সেবাপ্রার্থী শিশুদের অভিভাবকরা। গতকাল রবিবার দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর শের-ই-বাংলানগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগের শৌচাগারের সামনে এ দৃশ্য দেখা যায়।
টাইলস করা মেঝে স্যাঁতসেঁতে কাদাময় থাকায় এমন সতর্কতা এখানে আসা একে অপরের প্রতি। আগেরদিন গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে নিজের কক্ষে ধূমপান করতে দেখেন। পাশাপাশি কক্ষের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এই নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার মধ্যেই গতকাল রবিবার হাসপাতালে গিয়ে এমন অপরিচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায়।
তবে এ সময় ‘ডাক্তার ও নার্সদের জন্য’ নির্ধারিত শৌচাগার তুলনামূলক পরিষ্কার দেখা যায়। বহির্বিভাগের দক্ষিণ পাশের একতলা ভবনে ডাক্তার ও নার্সদের জন্য নির্ধারিত শৌচাগারে গিয়ে দেখা যায়–হাই কমোড ও লো কমোড আছে। তা ছাড়া ফ্ল্যাশ, সিট কাভার মোছার তোয়ালে সবকিছুই ছিল ঠিকঠাক। এক্সহস্ট ফ্যান চলছিল অবিরত, মেঝে ছিল শুকনো।
আরও পড়ুন
যদিও এর আগে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই বাম পাশে প্রথম ভবনে ঢুকেও সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত শৌচাগারের অপরিচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায়। নিচতলায় শৌচাগারের ভেতর কোথাও পড়ে আছে শিশুদের ব্যবহৃত ডায়াপার, টিস্যু পেপার, মলের ছিটেফোঁটা ইত্যাদি। ফ্ল্যাশ নেই। অনেক পুরোনো হওয়ায় পানির কল থেকে সরু ধারায় অনবরত পানি পড়ছিল। মেঝে মোছার ময়লা ও ভেজা সরঞ্জাম সেখানেই রাখা। বেসিন নেই। হাই কমোড তো নেই।
এখানে ‘ক্যাশ কাউন্টার’ ও পূবালী ব্যাংকের একটি উপশাখায় বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততা। এখানেই কথা হয় সাইদুর রহমানের সঙ্গে। তার ১০ মাস বয়সী সন্তান সাইরিন আক্তার হাম ওয়ার্ডের ২ নম্বর শয্যায় ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে।
আরও পড়ুন
তিনি বললেন, এখানকার নার্সদের কিছু জিজ্ঞেস করলে বিরক্ত হন। বিশেষ করে নাইট ডিউটি করা নার্সদের সঙ্গে তো কথাই বলা যায় না। আমরাও কিছু বলি না, কারণ আমাদের বাচ্চার যদি কোনো ক্ষতি হয়, যদি তারা আরও অবহেলা করেন।
আরেক অভিভাবক কফিল উদ্দিন বলেন, এখানে মানুষের তুলনায় টয়লেটের সংখ্যা অনেক কম। যা আছে তার মধ্যে অনেকগুলো আবার ভাঙাচোরা, তাই বন্ধ করে রেখেছে।
আরও পড়ুন
বেলা ১টার দিকে টিনশেডের নিচে খোলা জায়গায় একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে ঝাড়ু দিতে দেখা যায়। ঝাড়ু দেওয়ার ফলে ধুলাবালি উড়তে থাকায় অনেকে অস্বস্তিতে পড়েন। কেউ কেউ নাক-মুখ ঢাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু শিশুরা থাকে অরক্ষিত। তারা ধুলাবালির ওড়াউড়ির মধ্যেই হাঁটাচলা ও দৌড়াদৌড়ি করছিল।
কাছেই ময়লার স্তূপ দেখিয়ে অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছিলেন, এভাবে খোলা জায়গায় ময়লা স্তূপ করে রাখা তো সবার জন্যই ক্ষতিকর। বিশেষ করে এটা যেহেতু শিশুদের হাসপাতাল, যেকোনো সময় যেকোনো শিশু গিয়ে ময়লার স্তূপ থেকে একটা চিকিৎসা বর্জ্য হাতে নিয়ে নিতেই পারে। তা ছাড়া খোলা জায়গায় হওয়ায় বাতাসের সঙ্গেও রোগ-জীবাণু ছড়াতে পারে। ফলে সুস্থ মানুষও এখানে এসে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন।
এ ছাড়া হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ক্যান্টিনে প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রির অভিযোগ অনেক পুরোনো।
সেখান থেকে সিগারেট কিনে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে করিডোরে ধূমপান করতেও দেখা যায়। আইসিইউ ও এনআইসিইউর মতো স্পর্শকাতর বিভাগের কাছাকাছি ধূমপানের অভিযোগও আছে।
এসবের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. বশির উদ্দিন গতকাল রবিবার তার কার্যালয়ে দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, বাথরুম তো আসলে বাসাবাড়ির মতো পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না। বাথরুমের কল লাগালে নতুন থাকতেই চুরি হয়ে যায়।
হাসপাতালের বিশেষায়িত ডেঙ্গু কর্নারে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব শয্যায় মশারি থাকলেও অনেক শয্যায় তা টাঙানো ছিল না। ফলে মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ বিষয়ে হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. বশির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তো মশারি টাঙাতে বলি, কিন্তু মানুষ যদি না টাঙায়, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না।’
