চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান রুহেলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে দখল করে কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পুকুর ভরাট ও সরকারের ১ কোটি ১২ লাখ টাকা রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপসহকারী পরিচালক তাপছির বিল্লাহ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪২৭ ও ৪৪৭ ধারায় অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গ্যাসমিন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মাহবুবুর রহমান রুহেল পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট, বালি ও ব্লক কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে মীরসরাইয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজ পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। পরে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদন্ত ও প্রতিবেদনেও জমির পরিমাণ এবং দখলসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেলওয়ের তৎকালীন সহকারী ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. অহিদুন্নবী ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ৩৭৫ দশমিক ৮৯ শতক জমি লিজের আবেদন করলেও পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজার বিএস ৫১১৯, ৫১২০ ও ৫১০৫ নম্বর দাগে মোট ৩৪২ দশমিক ৮০ শতক রেলভূমি ইতোমধ্যে তাদের দখলে ছিল।
ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, লিজ মঞ্জুর হওয়ার আগেই রেলওয়ের জমিতে ৬ হাজার ৪৮৯ বর্গফুটের একটি আধাপাকা কারখানা নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি ৯৯০ বর্গফুট জায়গায় দ্বিতল পাকা অফিস ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিজ ৭৪ শতক, দখলে ২২৮ শতক
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পরবর্তী সময়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গ্যাসমিন লিমিটেডকে পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজার বিএস ৫১১৯ নম্বর দাগে ৩২ হাজার ১৩০ বর্গফুট বা শূন্য দশমিক ৭৪ একর জমি অস্থায়ীভাবে, বার্ষিক নবায়নের ভিত্তিতে ব্যবহারের লাইসেন্স দেয়। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ এ বিষয়ে রেলওয়ে ও প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে চুক্তি হয়।
তবে মিরসরাই উপজেলা ভূমি অফিসের সরেজমিন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দুদক জানায়, বিএস ৫১১৯ ও ৫১২০ নম্বর দাগে মোট ২ দশমিক ২৮ একর বা ২২৮ শতক জমি মাহবুব উর রহমানের দখলে পাওয়া যায়। অথচ রেলওয়ে থেকে তাঁর নামে লাইসেন্স করা জমির পরিমাণ ছিল ৭৪ শতক। অর্থাৎ, লিজের অতিরিক্ত ১৫৪ শতক জমি দখলে রেখে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, দখল করা জমিতে ব্লক তৈরির কারখানা, অফিস ভবন, মসজিদ, অজুখানা, মাঠ ও পানির ট্যাংকির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কারখানা-সংলগ্ন মাঠটি নির্মিত ব্লক রাখা, রোদে শুকানো ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হতো বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুকুর ভরাট ও জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগ
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজার বিএস ৫১২০ নম্বর দাগে রেলওয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত জমির শ্রেণি ছিল পুকুর। অনুসন্ধানে পুকুর ভরাট কিংবা জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের কোনো নথি পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে দুদক। এ বিষয়ে আসামিও সংশ্লিষ্ট কোনো নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, লিজের অতিরিক্ত জমি দখলে রাখা, অনুমোদন ছাড়া পুকুর ভরাট এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে আসামি সরকারি সম্পদের ক্ষতি করেছেন।
রাজস্ব ক্ষতি ১ কোটি ১২ লাখ টাকা
এজাহারে জমির ব্যবহার ও লিজের হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ২ দশমিক ২৮ একর জমির বিপরীতে ভ্যাট ও আয়করসহ মোট লিজমূল্য হিসাব করা হয় ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৪৬ টাকা। অন্যদিকে, ওই সময়ে ৭৪ শতক জমির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ৪৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫২৯ টাকা পরিশোধ করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, দুই অঙ্কের পার্থক্য ১ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১১৭ টাকা। এই অর্থ বাংলাদেশ রেলওয়ে তথা সরকারের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করে মাহবুব উর রহমানের বিরুদ্ধে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় এই এজাহার দায়ের করা হয়েছে এবং মামলার তদন্তকালে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
তবে এজাহারে আনা অভিযোগের বিষয়ে মাহবুব উর রহমান বা গ্যাসমিন লিমিটেডের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
The post রেলের জমি দখল করে কারখানা, দুদকের মামলার জালে সাবেক এমপি রুহেল appeared first on বাংলাধারা.
