কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা গোপনীয়তা ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বানের মধ্য দিয়ে ঢাকায় শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী ২১তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম (বিআইজিএফ) ২০২৬ সম্মেলন।
গত ১৫ থেকে ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকেন্দ্রিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গঠনে সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (বিআইজিএফ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও তরুণ শিক্ষার্থীসহ দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। তিন দিনের আয়োজনে ১২টি অধিবেশন ও দুটি বিশেষ কর্মশালায় ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নীতিনির্ধারণের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
এআই যুগে বদলাতে হবে শাসনকাঠামো
সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, এআই শুধু একটি প্রযুক্তিগত উপাদান বা ইঞ্জিন নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থা, কর্মপ্রবাহ ও শাসনকাঠামোর আমূল পর্যালোচনা এবং পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো শক্তিশালী হলেও সাধারণ মানুষকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কার্যকর ডিজিটাল সেবার আওতায় আনা এবং অনলাইনে বাংলা ভাষার কনটেন্টের স্বল্পতা দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়েবসাইটের মোট কনটেন্টে বাংলা ভাষার অংশ মাত্র ০.১ শতাংশ বলে উল্লেখ করে তিনি মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট, ডিজিটাল সেবা ও এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনায় উঠে আসে, শুধু ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণই ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির সুবিধা যেন ভাষা, আর্থসামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো জনগোষ্ঠীর কাছে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থা।
উদ্বোধনী অধিবেশনে ইউএনজিআইএস মাল্টিস্টেকহোল্ডার কনসালটেশন গ্রুপের সদস্য ও বাংলাদেশের রেসপন্সিবল এআই অ্যাম্বাসেডর এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান বলেন, সাইবার হামলা, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া তথ্যের বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ডিজিটাল নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, কার্যকর প্রতিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি ডিজিটাল পরিসরে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।
এআই-নির্ভর সাইবার হুমকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ
সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনায় বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খলিল উর রহমান (অব.) জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোর সুরক্ষা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং এআইনির্ভর সাইবার হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
ডিপফেক, স্বয়ংক্রিয় ফিশিং ও অন্যান্য উদীয়মান সাইবার আক্রমণ ডিজিটাল পরিসরে আস্থা এবং নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, জনসচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য বলে আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বৈশ্বিক নীতিতে মানবাধিকার ও অনলাইন নিরাপত্তা
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরাও অনলাইনে নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সিঙ্গাপুর থেকে এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের (এপনিক) সিনিয়র অ্যাডভাইজার জয়েস চেন এবং জেনেভা থেকে জাতিসংঘের ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম (আইজিএফ) সচিবালয়ের ডিজিটাল পলিসি ও রেগুলেশন বিশেষজ্ঞ আনজা গেঙ্গো আলোচনায় অংশ নেন।
অনলাইন নিরাপত্তা, শিশুদের সুরক্ষা, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল পরিসরে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়গুলো তাদের আলোচনায় গুরুত্ব পায়। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন নীতিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে, যা একদিকে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত অধিকার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণে গুরুত্ব
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ আইজিএফ ডায়ালগ’ ও ‘বাংলাদেশ উইমেন আইজিএফ ডায়ালগ’-এর মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তি-সুবিধাপ্রাপ্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ডেটা প্রাইভেসি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক নীতিমালা ছিল বিভিন্ন অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব আলোচনায় প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ডিজিটাল পরিসরে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মানবকেন্দ্রিক সুশাসন নিয়ে আলোচনা করেন গাজীপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. আসাদুজ্জামান। ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে এআইয়ের যুগে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ’ শীর্ষক মূল বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল নারীদের অনলাইন ঝুঁকির নানা দিক তুলে ধরেন।
অসচেতনতায় ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার, একই ডিভাইস একাধিক মানুষের ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার কারণে নারীরা কীভাবে সাইবার স্পেসে অনিরাপদ হয়ে পড়ছেন, তা পরিসংখ্যানসহ বর্ণনা করেন তিনি। একই বিষয়ে কথা বলেন বিএনএনআরসির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হীরেন পণ্ডিত। এ ছাড়া তরুণদের ক্ষমতায়ন ও এআইয়ের যুগে তাদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন নাগরিকতার (সিইএফ) সক্ষমতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ মো. নুরুল ইসলাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ ও নারীদের শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না; ডিজিটাল নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়াতেও তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বৈশ্বিক ইন্টারনেট নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশের ভূমিকা
সম্মেলনের শেষ দিনে সাইবার অপরাধ দমন ও ক্রসবর্ডার ইন্টারনেট নীতিমালা নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে তিন দিনের আয়োজন শেষ হয়। ইন্টারনেট যেহেতু রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে পরিচালিত একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা, তাই সাইবার অপরাধ, ডেটা সুরক্ষা, অনলাইন অধিকার ও এআই গভর্ন্যান্সের মতো বিষয়ে কার্যকর সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন—এ বিষয়টি সম্মেলনের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়।
ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের মূল চ্যালেঞ্জ হলো, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এমন নীতিকাঠামো তৈরি করা, যা নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্মুক্ত ইন্টারনেট, মানবাধিকার, উদ্ভাবন এবং তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কারিগরি সম্প্রদায়, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের অংশগ্রহণে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্যও এই আলোচনা তাৎপর্যপূর্ণ। এআই ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রযুক্তির সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২১তম বিআইজিএফ সম্মেলনের আলোচনায় এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় এবং বিভিন্ন অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। একটি নিরাপদ, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি মানুষের অধিকার, আস্থা ও অংশগ্রহণকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখার বিষয়টিই এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।