চণ্ডীপাঠ, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো। গতকাল শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিয়েছেন ভক্তরা। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
আজ শনিবার মহাসপ্তমী। সকালে দেবী দুর্গার নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমাদি কল্পারম্ভ এবং সপ্তমীবিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামীকাল রবিবারও সপ্তমী তিথি থাকছে। এ কারণে সোমবার উদ্যাপিত হবে মহাষ্টমী।
দুর্গাপূজা ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে রাজধানীর ২৫৭টি পূজামণ্ডপে ২৪ ঘণ্টা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে জোরদার করা হয়েছে সাইবার মনিটরিং। এ ছাড়া রাজধানীর পূজামণ্ডপগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি নিরাপত্তায় প্রস্তুত রয়েছে কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও আনসার-ভিডিপি।
গতকাল সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা ঘিরে নাশকতা বা ভীতি সৃষ্টির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী, মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে দেবী দুর্গার পূজা করা হবে। চক্ষুদানের পর ভক্তরা আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে দেবীর আরাধনা করবেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের জন্য ভগবান রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। দেবীর আশীর্বাদে রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। শরৎকালে দেবীর এই আবাহন থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন বলে ধর্মীয় আখ্যান ও লোকবিশ্বাসে উল্লেখ রয়েছে।
গতকাল ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। বিভিন্ন মণ্ডপে বেলগাছের নিচে ঘট স্থাপন, দেবীর কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা কামনা করেন। সন্ধ্যায় দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।চণ্ডীপাঠ, ঢাক ও কাঁসরের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির ও পূজামণ্ডপ।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস বলেন, সংকল্প ও আরম্ভের সমন্বয়ে হয় ‘কল্পারম্ভ’। এর মাধ্যমে দেবীর কাছে প্রতিজ্ঞা করা হয়, সব নিয়ম মেনে পূজার্চনা সম্পন্ন করা হবে। বিশ্ব থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা ও শান্তি কামনায় দেবীর চরণে গন্ধ, পুষ্প, অর্ঘ্য ও বাদ্যসহ বিভিন্ন উপাচার নিবেদন করা হয়।
তিনি বলেন, স্বর্গের স্বামীগৃহ ছেড়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যে তাঁর পিতৃগৃহে আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকেন চার সন্তান গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। দেবীর আগমনকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। বোধনের মধ্য দিয়ে দেবীর নিদ্রা ভাঙানোর প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে পূজার আয়োজন। ঢাক ও কাঁসরের বাদ্যে মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সৌরভে পূজামণ্ডপগুলোতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বাহারি আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে মন্দির ও মণ্ডপ। ভোর থেকেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেবীর আরাধনায় ভক্তদের উপস্থিতি দেখা যায়।
দুর্গাপূজা ঘিরে রাজধানীর ২৫৭টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ডিএমপি। এসব মণ্ডপে অতিরিক্ত ২ হাজার ৭২ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর নয়টি বড় পূজামণ্ডপে পুলিশ ও আনসার মিলিয়ে ৫০ জন করে সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি মণ্ডপের সিসি ক্যামেরা ডিএমপির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরেও বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শেষ দিনে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে ওয়াইজঘাটে গিয়ে শেষ হবে। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার।
দুর্গাপূজায় সারা দেশের ২ হাজার ৭২৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ২১টি বেস ক্যাম্প। গতকাল সকালে বিজিবি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বাহিনীর পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ।
তিনি জানান, সীমান্তবর্তী ১ হাজার ৪২৫টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকির জন্য চালু করা হয়েছে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং বিশেষ মনিটরিং সেল।
দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশে উদ্যাপন নিশ্চিত করতে ঢাকা জেলা ও মহানগরীর ১ হাজার ১২৬টি পূজামণ্ডপে ৭ হাজার ৩২৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ছয়টি আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিম।
সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পূজার দিনগুলোতে ভক্তদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন এবং উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ইএন/এসএ
