কয়েক দশক ধরে চীনে প্রাণিজ প্রোটিনের প্রধান উৎস ছিল শূকরের মাংস। দেশটির শ্রমিক থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার কর্মীদের খাবারের বড় অংশ জোগাত এই মাংস। একসময় বিশ্বের মোট শূকরের প্রায় অর্ধেকের আবাস ছিল চীন। এসব শূকরের খাদ্যের জন্য বিপুল পরিমাণ শস্য ও সয়াবিনের প্রয়োজন হতো। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্যের বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছিল চীনের চাহিদার।
শূকরের মাংসের এই বিশাল বাজারের ওপর নির্ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন হেবেই প্রদেশের ছোট খামারি হুয়াং ওয়েইইংয়ের মতো অনেকে। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি নিজ গ্রামে শূকর পালন শুরু করেন। একসময় তার খামারে শূকরের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু সেই সময় এখন অতীত। গত আগস্টে তার খামারে গিয়ে দেখা যায়, মাকড়সার জালে ঢাকা একটি ঘরে নিজের শেষ ১০টি শূকরকে খাবার দিচ্ছেন ৫৭ বছর বয়সী হুয়াং। প্রায় ৭৫ হাজার ডলার ঋণের বোঝা নিয়ে তিনি শরৎকালের মধ্যেই শূকরগুলো জবাই করে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছিলেন।
হুয়াং বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শূকর পালন করছি। কিন্তু গত দুই বছরের মতো কঠিন সময় আর আসেনি। শূকরের দাম এত কম যে শহরের মানুষ যেন শূকরের মাংস খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ঐতিহ্যবাহী চীনা খাবারে ব্যবহৃত চর্বিযুক্ত শূকরের মাংসের জনপ্রিয়তা কমছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচেতন শহুরে ক্রেতারা এখন তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারি তথ্য ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর মাথাপিছু শূকরের মাংস খাওয়ার পরিমাণ ১৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাথাপিছু মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি।
তবে মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলালেও মাংস ও দুগ্ধপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রবণতা থামেনি। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ২০১৮ সালের আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারের প্রাদুর্ভাব ও করোনা মহামারির পর শূকরের সংখ্যা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার বড় উৎপাদকদের ভর্তুকি দিয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎসাহিত করেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের কৃষি উৎপাদকদের মোট খামার আয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ এসেছে সরকারি ভর্তুকি থেকে। ২০০০-এর দশকের শুরুর তুলনায় এই হার প্রায় তিন গুণ।
বিজ্ঞাপন
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে রেকর্ড ৫ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন শূকরের মাংস উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে হাঁস-মুরগির মাংস উৎপাদন বেড়েছে ৭ শতাংশ। দুগ্ধপণ্য খাতেও ২০২৫ সালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
দেশের ভেতরে চাহিদা সবচেয়ে দুর্বল হওয়ায় শূকরের মাংসের দাম সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। তবে মুরগির মাংস ও দুগ্ধপণ্যের দামও কমেছে।
বিজ্ঞাপন
চীনের এই পরিস্থিতি একদিকে উৎপাদকদের জন্য বাড়তি পণ্য বিদেশে বিক্রির সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র করছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, সরকারি সহায়তা এবং ভোক্তাদের বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস—এই তিনের সমন্বয়ে চীন এখন প্রাণিজ প্রোটিনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
