সকালে অফিস যাবেন বলে পাবলিক বাসে উঠলেন। কোনোরকমে সিট পেয়ে তো বসা গেল, কিন্তু পাশেই যে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর পকেটে বেজে যাচ্ছে হালের বলিউড সিনেমার কোনো গান। একে তো লোকে ঠাসা বাসে যানজটে বসে রয়েছেন; তার ওপর কানের পাশেই এমন অত্যাচার। অথবা বাসের ড্রাইভার নিজেই স্পিকারে জোরে গান বা ওয়াজ শুনছেন। তিনি বুঝতেই পারছেন না এতে বাসে থাকা যাত্রীদের কারও অসুবিধা হতে পারে। অসুবিধার কথা জানালেও যে পাল্টা জবাব শুনতে হবে না এমনও তো নয়! শুধু আমাদের দেশেই নয়; পাবলিক বাস, ট্রেন বা বিমানে ভ্রমণের সময় হেডফোন ছাড়া লাউডস্পিকারে উচ্চশব্দে গান শোনা বা ভিডিও দেখা বর্তমানে একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একে কেন্দ্র করে যাত্রী ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও শহরে কঠোর নিয়ম ও জরিমানার বিধান চালু করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জেনে নিন এখানে–
সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরের পাবলিক বাসে হেডফোন ছাড়া লাউডস্পিকারে গান বা ভিডিও বাজানো ও অন্য যাত্রীদের বিরক্ত করার মতো অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার অর্থাৎ প্রায় ৩৯০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানার নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অসৌজন্যমূলকভাবে খাওয়া-দাওয়া করা, ময়লা ফেলা বা সিটে পা রাখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আরও গুরুতর অপরাধ—যেমন বাস ইন্টারচেঞ্জে বাধার সৃষ্টি করা বা যানবাহন অপরিষ্কার করার ক্ষেত্রে জরিমানা সর্বোচ্চ ৫ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ নিয়ম বাস চালকরা সরাসরি প্রয়োগ করবেন না। অনুমোদিত টিকিট পরিদর্শক ও বাস অপারেটরের কর্মচারীরা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ল্যান্ড ট্রানজিট অথরিটির কাছে রিপোর্ট করবেন। চালকরা কেবল অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যেতে বলতে পারবেন এবং প্রয়োজনবোধে পুলিশের সহায়তা নেবেন।
জাপান
জাপানের ট্রেন বা বাসের ভেতরে সামাজিক শিষ্টাচার ও নীরবতা অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। যানবাহনে ওঠার আগেই মোবাইল ফোন ম্যানার মোডে রাখার নির্দেশনা থাকে। উচ্চশব্দে গান বাজানো বা স্পিকারে ফোন ব্যবহারকে চরম সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। লঙ্ঘন করলে কন্ডাক্টরের সতর্কতা ও সামাজিক তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়।
দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবওয়ে ও বাসে শব্দদূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকে। হেডফোন ছাড়া অডিও বাজানো নিষিদ্ধ এবং নিয়ম অমান্য করলে পরিবহন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জরিমানা ও তিরস্কারের বিধান রয়েছে।

যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্য সরকার গণপরিবহনে শব্দদূষণ ও অসামাজিক আচরণ বন্ধে "শেয়ার দ্য জার্নি নট দ্য নয়েজ" শীর্ষক একটি জাতীয় সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছে। বাসে উচ্চশব্দে গান বাজানো, ধূমপান বা ময়লা ফেলার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ১০০ ইউরো পর্যন্ত স্পট ফাইন বা ফিক্সড পেনাল্টি নোটিশ জারি করার ক্ষমতা পেয়েছে।
রেল নেটওয়ার্কে নির্দেশ অমান্য করে উচ্চশব্দে মিডিয়া চালালে পরবর্তী স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া এবং রেলওয়ে বাই-ল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা ও প্রসিকিউশনের মুখোমুখি হতে হতে পারে। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা এ ধরনের অসামাজিক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়ে আসছে।

গণপরিবহন একটি সর্বজনীন সামাজিক স্থান, যেখানে প্রতিটি যাত্রীর স্বাচ্ছন্দ্যময় ও শান্ত পরিবেশে যাতায়াত করার অধিকার রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কঠোর আইন, সাইলেন্ট জোন বাস্তবায়ন ও আর্থিক জরিমানার প্রয়োগ যাত্রীদের দায়িত্বশীল ও সচেতন আচরণে উৎসাহিত করছে।
সূত্র: ট্রাভেল টুমরো, দ্য নিউজ, আইটিভি নিউজ
