ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দেওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে আর মাত্র ছয় দিন বাকি। তবে নিষেধাজ্ঞার শেষ প্রান্তে এসেও ঝালকাঠির বিভিন্ন নদীতে প্রকাশ্যে মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের অভিযান চললেও মৎস্য দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জেলেদের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, নদীতে নিয়মিত ও কার্যকর টহল না থাকায় সুযোগ নিয়ে মৌসুমি জেলেরা ইলিশ শিকার করছেন।
গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও কেনাবেচাসহ সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে সরকার। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ রক্ষায় ঝালকাঠির সুগন্ধা, বিষখালী ও হলতা নদীসহ জেলার বিভিন্ন নদীপথে অভিযান পরিচালনা করছে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ।
জেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর গত ১৫ দিনে ২২৬টি দল নদীতে অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে ৩৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ছয়টি মামলা করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে তিন জেলেকে। তাঁদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ৮৪ কেজি ইলিশ ও প্রায় ৫৩ হাজার ৯১০ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা জালের আনুমানিক মূল্য ১০ লাখ ৫ হাজার ১০০ টাকা। পরে এসব জাল আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
তবে অভিযানের এই পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট নন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা অনেক জেলে। তাঁদের দাবি, নদীতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জেলে নামলেও অভিযানে আটক ও নৌকা জব্দের সংখ্যা খুবই কম। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের খবর আগে থেকেই অনেক জেলের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে অভিযানকারী দল নদীতে যাওয়ার আগেই অনেক জেলে তীরে উঠে যান।
জেলে সমিতির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, মৎস্য বিভাগের অভিযানের তুলনায় উপজেলা প্রশাসনের অভিযান বেশি কার্যকর। তাঁদের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নদীতে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করলেও জেলা মৎস্য দপ্তরের নৌযান অনেক সময় ঘাটে পড়ে থাকে। নিষেধাজ্ঞার শুরুতে নৌযান নিয়ে নদীতে অভিযান ও ছবি তোলা হলেও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টহল দেখা যায় না বলেও অভিযোগ তাঁদের।
তাঁদের আরও অভিযোগ, অভিযানের সময় জাল ও মাছ জব্দ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নৌকা বা ট্রলার জব্দ কিংবা ধ্বংস করা হয়নি। অথচ নদীতে শত শত জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরছেন বলে দাবি তাঁদের।
সুগন্ধা নদীতে মাছ শিকার করা জেলে বিপ্লব মালয়, হাকিম ও রুস্তমসহ কয়েকজন বলেন, মৎস্য কর্মকর্তারা নদীতে নেমে অল্প সময় ঘোরাঘুরি করে ফিরে যান। তাঁদের ভাষ্য, কর্মকর্তাদের সামনে জেলেরা মাছ শিকার করলেও অনেক সময় তাঁদের ধাওয়া করা হয় না। এমনকি কোথায় মাছ শিকার হচ্ছে, তা দেখিয়ে দিলেও অভিযানে অন্যদিকে চলে যাওয়ার অভিযোগ করেন তাঁরা।
তাঁরা বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় তাঁরা মাছ শিকার করছেন না। কারাগারে বন্দী থাকার মতো বাড়িতে বসে সময় পার করছেন। অথচ অন্যরা নদীতে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিষখালী নদীতে মাছ শিকার করা জেলে মো. হানিফ হাওলাদার, মো. সুমন, কাদের ও সিরাজুলসহ কয়েকজন বলেন, নদীতে সারাদিন তেমন কোনো অভিযান থাকে না। মৎস্য অফিসের লোকজন এসে কিছুক্ষণ ঘুরে চলে যান। নদী ফাঁকা থাকে। অন্যদিকে জেলেদের ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হলেও তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই অনেকে বাধ্য হয়ে নদীতে মাছ ধরতে নামছেন।
জেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঝালকাঠি জেলায় প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। এর মধ্যে সুগন্ধা, বিষখালী ও হলতা নদীতে ইলিশের বিচরণ তুলনামূলক বেশি। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে এসব নদীতে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের জন্য সরকারি খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলেও তা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে তাঁদের একটি অংশের মধ্যে। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত পরিমাণ চাল দিয়ে ২২ দিনের সংসার চালানো কঠিন। এ কারণে অনেক দরিদ্র জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মা ইলিশ রক্ষায় শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; নদীতে নিয়মিত নজরদারি, নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল এবং জব্দ করা নৌযান ও জালের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।
তবে মৎস্য বিভাগের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এনামুল হোসেন। তিনি বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা মিথ্যা। মা ইলিশ রক্ষায় তাঁরা প্রতিদিন নদীতে থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। জনবলসংকট থাকায় একসঙ্গে বেশি দল নদীতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আরা মৌরি বলেন, নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে দুজনকে আটক করে তাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ। মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞার শেষ দিন পর্যন্ত জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
