স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য নয়। বাংলাদেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ধর্মীয় পরিচয়ের আগে সবার পরিচয় বাংলাদেশি নাগরিক। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি করে কেউ দেশের মানুষকে আলাদা করতে পারবে না।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জেএম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন- যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, ধর্মীয় সম্প্রীতি থাকবে। আমি খুব সচেতনভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শব্দটি এড়িয়ে চলি। কারণ, আমরা আইনিভাবে সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দিই না। পৃথিবীর সব দেশেই বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু থাকেন। আমরা কাউকে সংখ্যালঘু হিসেবে উপমা দিতে চাই না। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও মন্দির পরিদর্শন করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জেএম সেন হলে এসেছেন। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা এ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও সব ধর্মের ভাইবোনেরা রক্ত দিয়েছেন। আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমাদের সবার পরিচয় বাংলাদেশি। এরপর আমরা কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা অন্য ধর্মের অনুসারী।’
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনীতি করার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘আমরা ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন চাইনি, চাই না। ধর্মের ভিত্তিতে কোনো রাজনীতি করি না। যারা আপনাদের ভোটব্যাংক হিসেবে সব সময় মনে করত, গতবার আপনারা তাদের সেই ভ্রম ভেঙে দিয়েছেন। আপনারা আস্থা প্রকাশ করেছেন, আমরাও বিশ্বাস রেখেছি। এই আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক আমাদের নেতা তারেক রহমান।’
সবার সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনি অধিকার রয়েছে। ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। সংবিধানও এ ধরনের বৈষম্য স্বীকার করে না। সরকার সংবিধানের বিধান অনুসারে সব নাগরিকের অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংবিধান অনুসারে আপনাদের সব আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও উপাসনালয়ের সমান অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আপনারা যে আস্থা রেখেছেন, সেই বিশ্বাসের মর্যাদা আমরা রাখতে চাই। সবাই মিলেমিশে বাংলাদেশি হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। কেউ আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারবে না।’
দুর্গাপূজার ছুটি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা, বরাদ্দ, নিরাপত্তা ও ছুটির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সরকার মনে করছে। পূজার ছুটি বাড়ানোর দাবি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্জুর করেছেন। আগামী বছর প্রয়োজন অনুসারে নির্বাহী আদেশে আরও ছুটি দেওয়া যায় কি না, তা প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ধর্মাবলম্বীরই কিছু দাবি থাকে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও সরকারি ছুটি চান। অন্যান্য ধর্মের মানুষেরও দাবি রয়েছে। সবকিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আগামী বছর এ ধরনের পরিস্থিতি এলে তখন কী করা যায়, তা বিবেচনা করা হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এবার তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও হাসিমুখে ভোটকেন্দ্রে গেছেন। অনেকে সকালেই স্নান করে, সিঁদুর পরে ভোট দিতে গেছেন। তাদের এ অংশগ্রহণকে তিনি নাগরিক আস্থা ও গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কাউকে ভোটব্যাংক না হয়ে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান।
ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বক্তব্য ও হুমকির মাধ্যমে দেশে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হয়। তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য বজায় থাকলে এ ধরনের চেষ্টা সফল হবে না। সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তি দখল ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অতীতের বিভিন্ন ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, হরিমন্দিরের সম্পত্তি দখল, জগদীশকে কুপিয়ে হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্পত্তি দখল ও লুটপাটের ঘটনাও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।
ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি উদ্ধারের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন, ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে মন্দিরের তিন বিঘা জমি উদ্ধার করা হয়েছিল। মন্দিরের আরও কিছু জমি বেদখলে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেগুলো উদ্ধারের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতে সম্পত্তি দখলের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানানো হলেও সব ক্ষেত্রে কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে অর্পিত সম্পত্তি দখল করে রেখেছিল। ১৯৭২-৭৩ সালে বিএনপির জন্মও হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বর্তমানে বেদখলে থাকা সম্পত্তি উদ্ধারে সরকার উদ্যোগ নেবে বলে আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকদের ওই কাজ নেই। আমরা সেগুলো দখলমুক্ত করে দিতে পারব- এ বিশ্বাস থেকেই আপনারা দাবি করেছেন। আপনারা ভবিষ্যতে দেখতে পাবেন, প্রধানমন্ত্রী এ দেশের সব ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কী কী কাজ করেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেকে সমালোচনা করেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে। এগুলোই হচ্ছে সেই পরিকল্পনার অংশ। আমরা বাস্তবে তা করে দেখাতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি এবং সেই বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করতে চাই।
বক্তব্যের শেষে সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চায় সরকার। পরে সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানান তিনি।
