কক্সবাজারে বেড়াতে এসে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারাচ্ছেন পর্যটক। আবার শহরের বাইরে সড়কে অস্ত্রের মুখে জিম্মি হয়ে লুটপাটের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। একদিকে হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ডাকাতি, শহরে ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা–সব মিলিয়ে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত শনিবার উখিয়ার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর দুই দিন পর, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে দুই দফায় লুটপাটের ঘটনা ঘটে। যাত্রীদের অভিযোগ, মুখোশধারী সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা অন্তত ৫০টি যানবাহন থামিয়ে শতাধিক যাত্রীর টাকা, মুঠোফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকায় রেনেসাঁ হোটেলের বারে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। এ ছাড়া ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সিটি কলেজ গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ এক নির্মাণশ্রমিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এসব ঘটনা পর্যটন শহরটির সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আরও পড়ুন
দুই দফায় সড়কে লুটপাট
গত সোমবার সকালে ও দুপুরে ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের হিমছড়ি ঢালা এলাকায় লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখোশধারী ৮ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র দল সড়কে যানবাহনের গতিরোধ করে যাত্রীদের জিম্মি করে। পরে তাদের কয়েকজনকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করে টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, দুই দফায় প্রায় ৫০টি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল থামিয়ে ১২০ থেকে ১৫০ জন যাত্রীর কাছ থেকে মালামাল লুট করা হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে লুটপাট চললেও ঘটনাস্থলে পুলিশের টহল ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক যাত্রী। তবে আক্রান্ত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম সিফাতুল মাজদার বলেন, স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যানবাহনে লুটপাট চালিয়ে জঙ্গলে আত্মগোপন করেছে। তাদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। ওই এলাকায় টহলও জোরদার করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
ঈদগড়ের ব্যবসায়ী আমজাদ উল্লাহ বলেন, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে দোকানের মালামাল কেনার জন্য তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঈদগড় থেকে ঈদগাঁও বাজারে যাচ্ছিলেন। হিমছড়ি ঢালায় পৌঁছালে ৮ থেকে ১০ জন মুখোশধারী সশস্ত্র ব্যক্তি তার পথরোধ করেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা ৬০ হাজার টাকা ও ২৫ হাজার টাকা দামের একটি অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
হামিদুর রহমান নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, সকাল ও দুপুরে দুই দফায় প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ধরে সড়কে লুটপাট চলে। এ সময় প্রায় ৫০টি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের ১২০ থেকে ১৫০ জন যাত্রীকে জিম্মি করে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে তার দাবি।
একটি বেসরকারি সংস্থার ঈদগড় শাখার হিসাবরক্ষক আবদুল হাকিম বলেন, তারা তিনজন একটি অটোরিকশায় ঈদগাঁও থেকে ঈদগড় বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ও ব্যাংকের চেকবই ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এ সড়কে প্রায়ই লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন আবদুল হাকিম। তার ভাষ্য, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। অথচ যাত্রীদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।
ঈদগড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ তারেক গত সোমবার ডাকাতির শিকার হন। তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঈদগাঁও থেকে ঈদগড় যাচ্ছিলেন। হিমছড়ি ঢালায় পৌঁছালে তাদের অটোরিকশাটি দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে। এ সময় তার মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি চলন্ত অটোরিকশা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান।
পর্যটন শহরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
কক্সবাজারে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক বেড়াতে আসেন। সমুদ্রসৈকত ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত করেন তারা। কিন্তু আবাসন থেকে শুরু করে সড়কপথে চলাচল–সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে পর্যটনশিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উখিয়ার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে লুটপাটের ঘটনা দুর্গম ও বনঘেরা পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এনেছে। শহরে ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কক্সবাজারে বেড়াতে আসা কয়েকজন পর্যটক জানান, তারা হোটেল-রিসোর্টে থাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই নিরাপদ পরিবেশ প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বিভিন্ন অপরাধ ও দুর্ঘটনার খবর তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
ঢাকার মালিবাগ থেকে আসা পর্যটক শান্ত ইসলাম বলেন, ‘পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসে আমরা নিরাপদ পরিবেশ চাই। হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় ছিনতাই ও অপরাধ দমনে নজরদারি বাড়ানো দরকার। যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও নিয়মিত পুলিশি টহল থাকা উচিত, যাতে পর্যটকরা নির্ভয়ে ঘুরতে পারেন।’
কক্সবাজার নাগরিক সমাজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, পর্যটনশিল্পের বিকাশে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্র ও যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও অপরাধের ঘটনায় পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। অপরাধ সংঘটনের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আত্মগোপনে গেলেও তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানের মাধ্যমে অধিকাংশ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। পর্যটক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
পর্যটনশিল্পের বিকাশে কক্সবাজারের আবাসন, বিনোদন ও যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। হোটেল-রিসোর্টে কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিয়মিত টহল এবং অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।
