আবু হায়াত বিশ্বাস, নয়া দিল্লি: রাজনৈতিক প্রতিরোধ চলবে, সেই সঙ্গে গণপ্রতিরোধও জারি থাকবে। শেষ পর্যন্ত জয় হবে মানুষেরই। মঙ্গলবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই বার্তাই দিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, ‘ভোট চুরি’র সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে অল আউট আক্রমণে নেমেছে বিরোধী শিবির। দেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা চলবে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা বিচারাধীন থাকলেও রাস্তায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। তবে উৎসবের কয়েকদিন আন্দোলন স্থগিত রাখা হতে পারে বলেই খবর। একটি সূত্রের দাবি, উৎসবের মরশুমের কথা মাথায় রেখে দশেরা পর্যন্ত বড়সড় কোনও আন্দোলনে নামছে না বিরোধীরা। এদিন দিল্লিতে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বাসভবনে ইন্ডিয়া দলগুলির নেতারা চা-চক্রে মিলিত হন। বৈঠকে বিরোধী বিরোধী নেতাদের পাশাপাশি ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক চলে প্রায় ২ ঘণ্টা। ঠিক হয়, জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন জারি রাখা হবে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা। দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সকলেই একজোট বলে দাবি করেন রাহুল।
গত এক সপ্তাহের মধ্যে বিরোধী নেতারা ৬ বার বৈঠক করলেন। বিজেপি সরকার যে তাদের আন্দোলনে ভয় পেয়েছে, সেকথা জোর গলায় দাবি করছেন বিরোধী নেতারা। সোমবার দিল্লিতে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ পথে নেমেছিল। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়ায় অভিভূত বিরোধী শিবির। সূত্রের খবর, টানা কয়েক দিন আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর বুধবার এক দিনের বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরপর আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করে নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। উৎসবের কয়েকদিন আন্দোলন বন্ধ রাখা হবে না কি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, সে বিষয়ে এদিনের বৈঠকে কথা হয়েছে হয়েছে। আগামী কয়েকদিনে আলোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে ইন্ডিয়া। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবির পাশাপাশি যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আন্দোলন আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছেন বিরোধী নেতারা।
এদিনের বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল দাবি করেন,‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা আদায় করাই আমাদের লক্ষ্য। এর জন্য যত সময় লাগুক, এক দিন, তিন মাস, ছয় মাস—এক বছর কিংবা দু’বছর, আমাদের আন্দোলন চলবে।’ তাঁর কথায়, দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে বিরোধীরা। রাহুলের অভিযোগ, দেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাকেও শেষ করে দেওয়া হয়েছে এবং সংবিধানকে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করছেন বলেও জানান তিনি। বিরোধী বৈঠকে তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষ, মহুয়া মৈত্ররা উপস্থিত ছিলেন। সাগরিকা ঘোষ বলেছেন, ‘আমাদের দাবি স্পষ্ট, অবিলম্বে এসআইআর-এর কাজ বন্ধ করতে হবে এবং আগের ভোটার তালিকা ফিরিয়ে আনতে হবে। জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরাতে হবে এবং তাঁর পাশাপাশি সীমা খান্না-সহ ভোট চুরির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত আধিকারিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু করতে হবে।’
এদিনের বৈঠকে সমাজবাদী পার্টির তরফে সাংসদ ইকরা হাসান, দলের নেতা হরেন্দ্র মালিক উপস্থিত ছিলেন। মালিক বলেছেন,ন্যায়ের লড়াইয়ে ইন্ডিয়া ব্লক ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়বে। আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বলেন, মোদি-শাহের ইশারায় কাজ করছেন জ্ঞানেশ কুমার। পুতুলের মতো কাজ করছে, এরজন্য তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। এনসিপির সুপ্রিয়া সুলে বলেন, সংবিধান দুর্বল করার চেষ্টা চলছে এবং তার দ্বারা সুরক্ষিত অধিকারগুলি বিপন্ন। শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউতের নিশানায় ছিল বিজেপি ও জ্ঞানেশ কুমার। রাহুলের বাসভবনে আয়োজিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সোনিয়া গান্ধি, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, সমাজবাদী পার্টির প্রতিনিধিরা, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, সিপিআই নেতা ডি রাজা-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও উপস্থিত ছিলেন। নাগরিক সমাজ ও ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং আয়েশার নেত্রী নেহা বোরাও।
এদিকে, রাহুল গান্ধীকে তীব্র আক্রমণ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মঙ্গলবার দাবি করেছেন, নির্বাচনে বারবার হারের পর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং মিডিয়া ইভেন্ট বা 'ঝুট কি গুঞ্জ' তৈরি করে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব নয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-কে কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দায়ী করার জন্য রাহুল গান্ধীর কড়া সমালোচনা করেন শাহ। ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও কংগ্রেস টানা চতুর্থবারের মতো বড়সড় হারের মুখোমুখি হবে।
রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে শাহ বলেন, "দিল্লিতে বিরোধী নেতাদের নিয়ে বিক্ষোভ দেখালেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যায় না। প্রকৃত ভারত রয়েছে ক্ষেতে-খামারে, গ্রাম-গঞ্জে, পাহাড়ে ও নদীতে, যেখানে রাহুল গান্ধীর পৌঁছতেও পারেন না।" একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, বিতর্কিত এই সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাঝে রাহুল গান্ধী প্রকৃতপক্ষে অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।
