‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’। কূটনীতিতে এ কথার বড় কদর। ভারতীয় রাজনীতিতে বারবার এ নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে, বিশেষত ভোটে।
চিতোরের রাজা ‘মহারাওয়াল’ রতন সিং ‘একান্ত’ সময় যাপন করছিলেন স্ত্রীর সঙ্গে। সন্দেহ হয়, কেউ তাঁদের ‘অলক্ষ্য’ থেকে ‘নজর’ রাখছে। তাঁদের দাম্পত্যের নিভৃতি উপভোগ করছে। এ তো বিকৃতকাম! তাছাড়া, মহারাজের বেডরুমে নজর দেওয়া অপরাধও বটে। সে-রাতে বেঁচে গেলেও পরে ধরা পড়ে গেল রাজপুরোহিত ও রতন সিংয়ের বিশেষ উপদেষ্টা রাঘব চেতন। অন্য কেউ হলে হয়তো প্রাণদণ্ড হত। কিন্তু অতীতের সম্পর্ক ও ‘গুরু’ বিবেচনা করে রতন সিং প্রাণ নেন না রাঘব চেতনের। বরং রাজ্য থেকে চলে যেতে বলেন। অপরাধ করেছি রাঘব চেতন। তবে এত তার জেদ, অপরাধের জন্য না ছিল অনুতাপ, না ছিল মনোকষ্ট। সে চলে যাওয়ার আগে কার্যত শাসিয়ে গেল রাজা রতন সিংকে। বলে গেল, এর কড়া মূল্য দিতে হবে চিতোরকে।
দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি অনেক দিন ধরে চেষ্টায় ছিলেন রাজপুতদের বাগে আনার। সেই স্বপ্নে ঘৃতাহুতি দিল রাঘব চেতন। সে, আলাউদ্দিনকে শোনায়, এমন এক কন্যের কথা, যে রূপে অপ্সরাদের হার মানাবে, গুণে দেবীতুল্য। এই কন্যে আর কেউ নয়, রাজা রতন সিংয়ের স্ত্রী পদ্মাবত। মজে যায় আলাউদ্দিনের মন। চিতোর দখল ও পদ্মাবতীকে কায়েম করা হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম অভিপ্রায়।
রাঘব চেতন এখানে যে কূটনৈতিক ফরমুলা অনুসরণ করে, তাকে বলা হয়, ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ বা ‘দ্য এনিমি অফ মাই এনিমি ইজ মাই ফ্রেন্ড’। রাঘব চেতনের ‘ব্যক্তিগত’ শত্রু রাজা রতন সিং। রতন সিংয়ের ‘রাজনৈতিক’ শত্রু আলাউদ্দিন। তাই আলাউদ্দিনের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে, রাঘব চেতন বড়সড় ষড়যন্ত্রের জাল বুনলেন, যাতে চিতোর হাতছাড়া হয় রতন সিংয়ের। ২০১৮-এ সঞ্জয় লীলা বনশালি নির্দেশিত ‘পদ্মাবত’ সিনেমায় রাঘব চেতনের এই স্বরূপ আমরা দেখতে পাই। বলা বাহুল্য, এই রাঘব চেতন বাস্তবের চরিত্র নয়, তার ঐতিহাসিক প্রামাণ্য নেই, মালিক মুহাম্মদ জায়সির ‘পদ্মাবত’ কাব্যে রাঘব চেতনের সাহিত্যিক উল্লেখ রয়েছে। কালাজাদুর দায়ে রতন সিং তাকে রাজ্য থেকে উৎখাত করেন। সঞ্জয় লীলা বনশালি ‘পদ্মাবত’ সিনেমায় প্রসঙ্গান্তর ঘটিয়ে রাঘব চেতনকে ভিন্নভাবে চিত্রিত করেছেন।
‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ প্রবাদটি লাতিন ভাষায় অন্যতর প্রচলন পেয়েছিল- ‘আমার যে বন্ধু সে হবে আমার শত্রুরও শত্রু’। পরে, অর্থান্তর ঘটে। কূটনীতিতে এ কথার প্রায়োগিক উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-য় ‘রাজমণ্ডল’ তত্ত্বের কথা বলা হয়েছিল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজা ভূ-নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের রাজাদের কেমন চোখে দেখবে, তা বলতে গিয়ে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ প্রবাদটি উল্লিখিত হয়েছে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে ঠেকাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন-ব্রিটেন জোটের সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার একত্রীকরণ এ প্রবাদের বাস্তব পরিণতি। ভারতীয় ভোট-রাজনীতিতে বারবার ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতি প্রতিফলিত হয়েছে। ‘সাদা-কালো’ বিভাজনের পৃথিবী যে কূটনীতিতে অচল, বলতে চায় প্রবাদটি। সঙ্গে কি নৈতিকতার মৃত্যুও ডেকে আনে?
