কক্সবাজারে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, নিহতদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা
বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ২৩ জনকে আসামি করে দায়ের করা এ মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে; বাকি আসামিরা অজ্ঞাতপরিচয়। এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে যাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তাঁদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। প্রয়োজনে ঢাকার বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, গত শনিবার রাতে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে শনিবার বিকালে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
নিহতদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং পরিচয়সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমানে মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই পরীক্ষা সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কক্সবাজারের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক এ অগ্নিদুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণে দ্রুত স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সাত ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে ১০ মরদেহ
গত শনিবার সকাল ৭টার দিকে উখিয়ার মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় দগ্ধ ও আগুন থেকে বাঁচতে গিয়ে আহত ছয় পর্যটক হাসপাতালে ভর্তি হন।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর কক্সবাজার থেকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় ২৫ মিনিট সময় নেয়। তবে কাঠ ও বোট দিয়ে তৈরি রিসোর্টটি দ্রুত আগুনে পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই ভেতরে আটকে পড়া কয়েকজন পর্যটকের মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নিহত ১০ জনের মধ্যে সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫) এবং আশুলিয়ার নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৮)। বাকি তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা মরদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক বিবরণ দিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের দোতলার একটি কক্ষে বিছানার ওপর পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া যায়। একই কক্ষের শৌচাগারে পাওয়া যায় আরও একজনের মরদেহ। তৃতীয় তলার একটি শৌচাগার থেকে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় আরও চারজনকে। আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সবার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আহত ছয় পর্যটক
অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শিহাব উদ্দীন (৩১) ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯)। অন্য আহতরা হলেন মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। আহতদের মধ্যে চারজনের শরীরের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে। বাকি দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, রিসোর্টের বিভিন্ন অংশে কাঠ ও প্লাস্টিকের বোর্ড ব্যবহার করায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ভেতরে থাকা পর্যটকদের নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান।
অগ্নিনিরাপত্তা ও নির্মাণ অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্মাণ অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এ বিষয়ে আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধ অনুমোদন নেয়নি।
অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, রিসোর্টটি নির্মাণের কোনো অনুমোদন ছিল না। মেরিন ড্রাইভ এলাকার আড়াই হাজার স্থাপনার মধ্যে ১৫০টি প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটিও ছিল। এসব অনুমোদনহীন রিসোর্টের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার পর্যটন ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, দিন দিন কক্সবাজারে পর্যটকের সমাগম বাড়ছে। সৈকত-সংলগ্ন খালি জমির স্বল্পতার কারণে মেরিন ড্রাইভকেন্দ্রিক হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ বেড়েছে। রিসোর্ট বা হোটেল থেকে সমুদ্রসৈকত দেখা গেলে কক্ষভাড়া বেশি নেওয়া যায়। এ কারণে অনেকে অল্প জমি কিনে কাঠ কিংবা ইটের গাঁথুনি দিয়ে প্রাকৃতিক রিসোর্টের নামে পর্যটন ব্যবসা শুরু করেছেন।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে বাড়তি পর্যটকদের আবাসনের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকায় মেরিন ড্রাইভসহ বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। অনলাইনে বিপণন জনপ্রিয় হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা সহজেই এসব রিসোর্টে এসে উঠছেন।
ওই সদস্যের ভাষ্য, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় তদারকি সীমিত থাকায় সৈকতে ডুবে যাওয়াসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা, বৈধ অনুমোদন এবং তদারকি জোরদারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
