Published on
:
2 min read
হায়দরাবাদের রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে অধিনায়ক শাই হোপের অতিমানবিক সেঞ্চুরিতে ভর করে সিরিজ়ে সমতা ফিরিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। কিন্তু মাঠের এই লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের আকাশে ঘনিয়ে এসেছে অন্ধকারের মেঘ। ভারতের মাটিতে আয়োজিত এই মেগা সিরিজ় থেকে BCCI সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি বাবদ আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি) ঘরে তুললেও, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের (CWI) ভাঁড়ার শূন্য।
বিগত কয়েক বছর ধরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ক্রিকেট বোর্ড আর্থিক দিক থেকে ধুঁকছে। বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল হলেও আর্থিক দিক থেকে তাদের এই বেহাল দশা একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ক্রিকেট বোর্ড আজ কেন দেউলিয়া হওয়ার মুখে, তা নিয়ে উইজডেন ম্যাগাজিনের পডকাস্ট ‘দ্য স্কুপ’-এ এসে এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন CWI-এর CEO ডার্ক ডেহরিং। ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির (ICC) বর্তমান দ্বিপাক্ষিক রেভিনিউ কাঠামোর বৈষম্যকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তিনি।
রাজস্ব পাচ্ছে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ক্রিকেট
ডেহরিং ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের এই সিরিজ় থেকে আমাদের বোর্ড একটি পয়সাও পাচ্ছে না, কারণ ম্যাচগুলো ভারতের মাটিতে হচ্ছে। যে সিরিজ় ভারতে অনায়াসে ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার আয় এনে দিচ্ছে, সেখান থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট শূন্য রাজস্ব পাচ্ছে।’
এই চরম দুরবস্থার নেপথ্যে থাকা ইতিহাসের পাতা উল্টে CWI-এর CEO জানান, এই সংকট শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। তিনি বলেন, ‘কী ভাবে এমনটা হলো তা বুঝতে হলে আপনাদের ১৯৯৭ সালে ফিরে যেতে হবে। আমি ভাগ্যবান কিংবা হয়তো দুর্ভাগ্যবান ছিলাম যে সেই সময় ICC-র ভোটাভুটির ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমি উপস্থিত ছিলাম। তার আগে পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ছিল বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দল। প্রত্যেকে চাইত আমরা তাঁদের দেশে গিয়ে খেলি। তখন অতিথি দলকে একটি মোটা অঙ্কের ‘ট্যুরিং ফি’ বা সফর ফি দেওয়া হতো, যা অনেক সময় আমাদের নিজেদের দেশে সিরিজ় আয়োজন করার মোট আয়ের চেয়েও বেশি হতো।’
প্রভাবশালীদের সঙ্গে হার ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের
কিন্তু ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রভাবশালী দেশগুলি একজোট হয়ে নিয়ম বদলে দেয়। নতুন নিয়মে স্থির হয়—দ্বিপাক্ষিক সিরিজ়ের ১০০ শতাংশ ব্রডকাস্টিং স্বত্ব ও টিকিট রাজস্ব আয়োজক দেশের পকেটে যাবে। সেই ভোটাভুটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছিল। ডেহরিং আক্ষেপ করে বলেন, ‘আইসিসির সদস্য দেশগুলি ৯-১ ব্যবধানে আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে হারিয়ে দিয়েছিল। আমি তখনই বলেছিলাম, এই সিদ্ধান্তটি ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের মৃত্যুপরোয়ানায় স্বাক্ষর করে দিল। কারণ এটি আমাদের আয়ের প্রধান উৎসকে এক ঝটকায় কেড়ে নিয়েছিল।’
জনসংখ্যার তারতম্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এই নিয়মের ফলে ভারত তাদের ১৫০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার থেকে পাওয়া সমস্ত রাজস্ব নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ়কে টিকে থাকতে হচ্ছে অ্যান্টিগুয়ার মতো ১ লাখ কিংবা সেন্ট কিটসের মতো মাত্র ৩০ হাজার জনসংখ্যার দ্বীপ থেকে আসা নামমাত্র রাজস্বের ওপর নির্ভর করে। এটা একেবারেই অবিচার।’
বোর্ডের এই আর্থিক রক্তক্ষরণ এখন চরমে পৌঁছেছে। ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো টিকিয়ে রাখতে গিয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়ছে উইন্ডিজ় বোর্ড। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্কটজনক যে আন্তর্জাতিক তারকাদের কেন্দ্রীয় চুক্তির রিটেইনার ফি-তে একলপ্তে ২৫ শতাংশ কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভারত সফর শেষ হওয়ার পরই ক্রিকেটারদের সেই কম টাকার চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। মাঠের লড়াইয়ে হয়তো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ, কিন্তু আইসিসির এই বৈষম্যমূলক আর্থিক নীতি অবিলম্বে সংস্কার না হলে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এক শক্তির মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাওয়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
