ঘোড়াঘাট প্রতিনিধি: গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘তান্ত্রিক পাতা খেলা’। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে থাকা এই শতবর্ষী খেলাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে আয়োজন করা হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রতিযোগিতা। খেলাটি ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঘোড়াঘাট পূর্বপাড়ার ফুটবল খেলার মাঠে এ খেলার আয়োজন করা হয়।
প্রতিযোগিতায় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছয়টি গুনিক দল অংশ নেয়। খেলাটি দেখতে শিশু, কিশোর, তরুণ, নারী ও প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমে। মুহূর্তেই পুরো এলাকা পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত লোকজ উৎসবে।
খেলার নিয়মও বেশ ব্যতিক্রমী। ‘তুলা রাশির’ ব্যক্তি, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাতা’ বলা হয়। মাঠের চারপাশে গোল হয়ে বসেন বিভিন্ন গুনিক দলের সদস্যরা। এরপর শুরু হয় তন্ত্র-মন্ত্র উচ্চারণ। প্রত্যেক দল নিজেদের আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে পাতাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। যে দল সবচেয়ে বেশি পাতাকে নিজের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হয়, সেই দলই বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়।
খেলা দেখতে আসা দর্শক মমিন বলেন,’ আধুনিকতার যুগে এমন ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা এখন খুব একটা দেখা যায় না। তাই এমন আয়োজন তাদের কাছে যেমন আনন্দের, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্যও এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।’
৭ বছর বয়সী হৃদয় মিয়া বলেন, পাতা খেলার নাম আগে শুনেছিলাম। কিন্তু আজকে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম, খেলাটি খুব মজার। তাই আগ্রহ নিয়ে দেখতে এসেছি প্রথমবার।
অংশগ্রহণকারী গুনিকদের দাবি, এই খেলার ইতিহাস বহু পুরোনো। এটি শুধু একটি খেলা নয়; বরং গ্রামীণ লোকবিশ্বাস, আধ্যাত্মিক চর্চা ও লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বিশ্বাস, তন্ত্র-মন্ত্রের শক্তির মাধ্যমেই পাতাকে বশ করে জয় নিশ্চিত করা সম্ভব। মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের কারণে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা আজ হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতেই তাদের এই উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও প্রতিবছর এ আয়োজন অব্যাহত রাখতে চান তারা।
নিয়মিতভাবে লোকজ খেলার আয়োজন করা গেলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের শেকড় ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য সংরক্ষণেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্রামবাংলার হাজার বছরের লোকঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, গবেষণা ও পৃষ্ঠপোষকতা। তান্ত্রিক পাতা খেলার মতো আয়োজন শুধু বিনোদনের খোরাকই জোগায় না, বরং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলায় ঘোড়াঘাট পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোস্তফার দল প্রথম স্থান অধিকার করে। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সুমনের দল এবং তৃতীয় স্থান লাভ করে পলাশবাড়ী উপজেলার মগলিশপুর গ্রামের দল।
খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ঘোড়াঘাট পৌর বিএনপির সভাপতি আবদুস সাত্তার মিলন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুক্তার হোসেনসহ উপজেলার বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
কেএমএএ/আপ্র/১৯.১০.২০২৬
