রাজধানী ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদী দীর্ঘদিন ধরে দূষণ, দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে রয়েছে। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য নদীগুলোর পানির মান এবং জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কোথাও পানির রং ও গুণগত মানের অবনতি ঘটছে, কোথাও বর্জ্য জমে ব্যাহত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ।
নদীগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নজরদারি ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নেওয়া হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে তুরাগ নদীর দূষণ পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাসহ ১৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব একনেকে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চার নদীর দূষণের উৎস বন্ধ, শিল্পবর্জ্য শোধন এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বুড়িগঙ্গা: একসময় ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, নৌপরিবহন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বুড়িগঙ্গা। এখন নদীটির বিভিন্ন অংশে কালচে পানি, দুর্গন্ধ ও বর্জ্যের উপস্থিতি দূষণের চিত্র তুলে ধরছে। শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে।
হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেওয়ার পরও বুড়িগঙ্গার দূষণ পুরোপুরি কমেনি। কারণ, দূষণের উৎস শুধু একটি শিল্প খাত নয়; অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্গমন এবং নদীতীরে বর্জ্য ফেলার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।
নদী পরিষ্কার এবং তলদেশ থেকে বর্জ্য তোলার উদ্যোগের পাশাপাশি দূষণের উৎস বন্ধ করা জরুরি। শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়ির বর্জ্য শোধন এবং নদীতীরে কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা না গেলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারবে না।
বালু নদী: রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বালু নদী। আশপাশের বসতি, নগরায়ণ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বর্জ্যের কারণে নদীটির পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। নদীটি পানি নিষ্কাশন, জলজ প্রাণীর আবাস এবং আশপাশের এলাকার পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য এবং বিভিন্ন নির্গমনস্থল থেকে আসা দূষণ বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের নদীগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বালু নদীর ক্ষেত্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, সংযোগ খাল এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখাও জরুরি।
নদীতীর দখল, বর্জ্য ফেলা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শীতলক্ষ্যা: নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য শীতলক্ষ্যা নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকারখানা, নৌপরিবহন ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নদীটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এসব কার্যক্রম থেকে নির্গত বর্জ্য সঠিকভাবে শোধন না হলে নদীর পানির মান ও জলজ পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়।
শীতলক্ষ্যার দূষণ নিয়ন্ত্রণে শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর রাখা, নির্গত পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কাগজে-কলমে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন নয়, সেটি নিয়মিত চালু আছে কি না, তা যাচাই করাও জরুরি।
তুরাগে ড্রোন নজরদারি, ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব: তুরাগ নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রস্তাবিত মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় ড্রোনের মাধ্যমে নদীর তীরে বর্জ্য ফেলার ঘটনা পর্যবেক্ষণ, দূষণের উৎস ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত এবং পরিবেশগত বিধিবিধান লঙ্ঘনকারী শিল্পকারখানার তালিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়মিত তদারকি, অভিযান, নোটিশ জারি এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তুরাগের তীরে চিহ্নিত ১৭৩টি কারখানার বর্জ্য শোধনাগারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নির্গত পানির মান পর্যবেক্ষণে স্থাপন করা হবে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহকারী অনলাইন ব্যবস্থা। এ ছাড়া নৌযানে টহল দিয়ে নদীর তলদেশ পরিষ্কার এবং প্রকল্প চলাকালে অন্তত ৩৬ বার পানির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ৩৩৩-৪ হেল্পলাইনকে সমন্বিত অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় উন্নীত করা, কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা মূল্যায়ন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ‘গ্রিন স্টার রেটিং’ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু তুরাগের দূষণ পর্যবেক্ষণ নয়; ঢাকা মহানগর এলাকার নদী, খাল ও লেকে কঠিন বর্জ্য এবং বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানার দূষিত পানি ফেলা কমানোও এর বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ।
