সংবাদ · সাধারণ
সৌদিতে নিহত নাসরুল্লাহর ৩ সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
১২/১০/২০২৬

সাত বছরের জামিল আহমেদ পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। পাঁচ বছরের নাবিলা আক্তার এবার প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। আর তিন বছরের আহমাদুল্লাহ জাওয়াদ এখনো মায়ের কোলে। বয়সের ভারে নয়, জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এই তিন শিশুর শৈশব এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে।তাদের বাবা মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী আর ফিরবেন না। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব যার কাঁধে ছিল, সেই মানুষটি এখন হাজার মাইল দূরে সৌদি আরবে লাশ হয়ে পড়ে আছেন। তার মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্ত্রী মহবুবা আক্তার ও স্বজনেরা। স্বামীকে হারানোর শোক কিছুতেই সামলে উঠতে পারছেন না মহবুবা। তিন সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সামনে এগোবেন, কীভাবে তাদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।সোমবার (১২ অক্টোবর) কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামে নাসরুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকাবহ দৃশ্য। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারটির।জানা গেছে, নাসরুল্লাহ রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানার পূর্ব রসূলপুর এলাকার জামিয়া আরাবিয়া রবীউল উলুম মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন। প্রায় ১২ বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। পরে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে সেখানে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। শিক্ষকতার আয় দিয়েই চলত তার সংসার। গত শনিবার ৪৫ সদস্যের একটি কাফেলার মুয়াল্লিম হিসেবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান নাসরুল্লাহ। কাফেলার সদস্যদের ওমরাহ পালনে সহযোগিতা করাই ছিল তার দায়িত্ব। পবিত্র ভূমিতে ইবাদত শেষে পরিবারের কাছে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই যাত্রার পরিণতি হলো মর্মান্তিক। বিমানবন্দরে এক হামলার ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান। একই ঘটনায় আহত হন তার চাচাতো ভাই ও সহকর্মী মাদরাসা শিক্ষক দাওউদ বিন মুহিব। তার একটি পা ভেঙে গেছে এবং আঘাত পেয়েছেন মুখমণ্ডলেও।সোমবার বদরপুর গ্রামে নাসরুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন বাড়িতে। কেউ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউবা নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। ছোট ছোট সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মহবুবা। যে মানুষটির সঙ্গে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, তার অনুপস্থিতিতে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চিত।স্বজনদের ভাষ্য, সন্তানদের এখনো বাবা হারানোর গভীরতা বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু তাদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে যে মানুষটির স্নেহ ও দায়িত্বশীল উপস্থিতি থাকার কথা ছিল, তিনি আর ফিরবেন না। তিন শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি পরিবারের এখন সবচেয়ে বড় অপেক্ষা—প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরে পাওয়া।নাসরুল্লাহর মৃত্যুর খবর কীভাবে পান, তার বিবরণ দিয়েছেন তার ভগ্নিপতি মাওলানা মো. নাসির উদ্দিন। তিনি জানান, রিয়াদের বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটির দুই ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। সেখান থেকে নাসরুল্লাহর জেদ্দায় যাওয়ার কথা ছিল। ট্রানজিট শেষে বোর্ডিং পাস নিয়ে উড়োজাহাজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। ঠিক তখনই হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে উড়োজাহাজে ওঠার সুযোগ পাননি নাসরুল্লাহ।ছেলের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না বাবা মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ। শোকাহত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা আল্লাহর ঘরে গিয়েছিল। কিন্তু সে ওমরাহটা করতে পারল না। সে এভাবে মারা যাবে, তা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। কত নির্মমভাবে আমার ছেলেটা মারা গেল, আল্লাহ ভালো জানেন। হয়তো আল্লাহপাক তাকে এভাবেই কবুল করেছেন।’ছেলের মরদেহ একবার দেখার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত যেন আমার ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আমার আদরের সন্তানকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই।’এর আগে রোববার রাতে নাসরুল্লাহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। সোমবার দিনভরও সেখানে মানুষের ভিড় ছিল।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আলী আহসান টিটু বলেন, ‘একজন শিক্ষকের মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণের অবসান হয়নি, থমকে গেছে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। শ্রম ও সীমিত আয় দিয়ে যে মানুষটি তিন সন্তানকে ঘিরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন, তার অনুপস্থিতিতে সেই স্বপ্নগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।’নাসরুল্লাহর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছে পরিবারটি।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗