
স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট নগরে বেওয়ারিশ কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ১৫ দিনব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে কর্মসূচির ৪ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম তিন দিনে টিকা পেয়েছে মাত্র ৬০৭টি। এতে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০২১ সালে নগরীতে কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর দীর্ঘসময় ধরে নগরীতে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সে সময় ১ হাজার ৭৬২টি কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ বছরের ব্যবধানে নগরে কুকুরের সংখ্যা বাড়লেও টিকাদান কার্যক্রমের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) অর্থায়নে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ১২ অক্টোবর সোমবার কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন দুই শিফটে চারটি দল টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চারজন সুপারভাইজারের অধীনে কাজ করছেন ২০ জন কর্মী। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিন দিনে মোট ৬০৭টি কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উদ্বোধনী দিনে ১৫০টি, দ্বিতীয় দিনে দুই শিফটে ২৩২টি এবং তৃতীয় দিনে প্রথম শিফটে ২২৫টি কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়।
সিসিকের ৪২টি ওয়ার্ডে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি দলে পাঁচজন করে সদস্য থাকবেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন কুকুর ধরার কাজে এবং একজন টিকা প্রয়োগের দায়িত্বে থাকবেন। অন্য সদস্য সহায়তা করবেন। টিকা দেওয়ার পর কুকুরের শরীরে বিশেষ রং দিয়ে চিহ্ন দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সিটি করপোরেশনের একজন মনোনীত প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মসূচিতে যুক্ত সিসিকের এক কর্মকর্তা বলেন, নগরে কুকুরের সংখ্যা বাড়লেও নির্ধারিত সময়ে ৪ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তাঁর ভাষ্য, কুকুর অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন ও চতুর প্রাণী। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলে কুকুরগুলো অনেকটা আড়ালে চলে যায়। ফলে স্বাভাবিক সময়ে রাস্তায় যেসব কুকুর দেখা যায়, সেগুলোকে খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, জলাতঙ্কের টিকা দিয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও কুকুরের উৎপাত কমাতে শুধু টিকাদান যথেষ্ট নয়। কুকুরের সংখ্যা ও বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
নগরের মিজাজাঙ্গাল, জামতলা, দাড়িয়াপাড়া, জালালাবাদ, উপশহর, শিবগঞ্জ, কুয়ারপাড় ও পীরমহল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাতের অভিযোগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, কুকুরের কামড়ের চেয়ে ধাওয়া করা ও দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরার কারণে ভোগান্তি বেশি হচ্ছে।
নগরবাসীর ভাষ্য, শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের দল ঘুরে বেড়ায়। রাতের বেলায় এ উৎপাত আরও বেড়ে যায়। পথচারী, শিক্ষার্থী, শিশু ও মোটরসাইকেল আরোহীদের অনেকেই কুকুরের ধাওয়ার শিকার হন। কোনো কোনো এলাকায় দলবদ্ধ কুকুরের কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
নগরবাসী মনে করেন, শুধু টিকাদান দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগে ২০১৮-১৯ সালে সিলেট নগরে বেওয়ারিশ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় নগরে কুকুরের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। আগের কর্মসূচির ফলে নগরে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। তিনি বলেন, সম্প্রতি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার দু-একটি ঘটনা নজরে এসেছে। এ কারণে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বেওয়ারিশ কুকুরকে ব্যাপক পরিসরে টিকার আওতায় আনা গেলে নগরে জলাতঙ্কের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এবারও আমরা আশাবাদী কার্যক্রমটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে। যদি দুই একদিন কমসূচি বাড়াতে হয় তাহলে আমরা সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলাপ করে বাড়িয়ে নেব।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নগরে বেওয়ারিশ কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে চার হাজার কুকুরকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কাজ করছেন। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। যদি কোথাও দলবদ্ধ কুকুর দেখা যায় তাহলে সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।’
