একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলে নিজের সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তাঁর আগের রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট, ওষুধের বিবরণ, ব্যক্তিগত পরিচয় এবং কখনো কখনো পরিবারের সংবেদনশীল তথ্যও চিকিৎসার প্রয়োজনে সংরক্ষণ করা হয়।
আগে এসব তথ্যের বড় অংশ কাগজের নথিতে থাকত। এখন হাসপাতালের ডিজিটাল ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, ডিজিটাল ইমেজিং এবং বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে।
- এই পরিবর্তন চিকিৎসাসেবাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হতে পারে এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
কিন্তু এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তৈরি হয়েছে—রোগীর তথ্য যেন সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং অনুমোদিত প্রয়োজন ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রকাশ না পায়।
আমার দৃষ্টিতে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু প্রযুক্তির সুবিধা নয়, রোগীর তথ্যের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
রোগীর তথ্য সাধারণ তথ্য নয়
- একজন মানুষের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। কোনো রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার ফল কিংবা চিকিৎসার বিবরণ অননুমোদিতভাবে প্রকাশিত হলে তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বস্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই রোগীর তথ্যকে শুধু হাসপাতালের পরিচালনাগত সম্পদ হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে মানুষের গোপনীয়তা, মর্যাদা এবং অধিকার জড়িয়ে রয়েছে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে তথ্য ব্যবহার করা এবং সেই তথ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া এক বিষয় নয়। হাসপাতালের কর্মী, চিকিৎসক, প্রযুক্তি বিভাগ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেরই এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে।
রোগীর তথ্য সংরক্ষণ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই তথ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও তেমন গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল ব্যবস্থা যত বাড়বে, দায়িত্বও তত বাড়বে
- ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীর তথ্য একাধিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। চিকিৎসক রিপোর্ট দেখছেন, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার তথ্য যুক্ত করছে, রেডিওলজি বিভাগ ছবি সংরক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মীরা তথ্য ব্যবহার করছেন।
এই সমন্বয় চিকিৎসাসেবাকে সহজ করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হয়, কে কোন তথ্য দেখতে পারবেন, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন এবং কীভাবে সেই তথ্যের নিরাপত্তা বজায় থাকবে।
এ জন্য শক্তিশালী প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব অনুযায়ী তথ্য ব্যবহারের অনুমতি, নিরাপদ লগইন ব্যবস্থা, নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
শুধু একটি সফটওয়্যার কিনে বা ডিজিটাল রেকর্ড চালু করেই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া এবং মানুষের আচরণ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
একটি ছোট অসতর্কতাও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে
তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত বড় ধরনের সাইবার হামলা বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথা ভাবি। কিন্তু দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনুমতি ছাড়া রোগীর রিপোর্ট অন্য কারও কাছে পাঠানো, ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা, অনিরাপদ মাধ্যমে নথি শেয়ার করা কিংবা অন্যের ব্যবহারকারীর পরিচয় ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করা—এসব আচরণ তথ্যের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
তাই তথ্যের নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব নয়। প্রতিটি কর্মীকে বুঝতে হবে, কোন তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সন্দেহজনক কিছু ঘটলে কোথায় জানাতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের উচিত কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তথ্য ব্যবহারের নিয়মগুলো পরিষ্কার রাখা। নিরাপদ ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা গড়ে ওঠে প্রযুক্তির পাশাপাশি দায়িত্বশীল অভ্যাসের মাধ্যমেও।
রোগীর আস্থা গড়তে স্বচ্ছতা প্রয়োজন
একজন রোগী যখন নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেন, তখন তিনি প্রত্যাশা করেন যে তথ্যটি চিকিৎসার প্রয়োজনে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হবে।
তাই হাসপাতালের উচিত রোগীর তথ্য কেন সংগ্রহ করা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে এবং কারা তা দেখতে পারবেন—এসব বিষয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার ধারণা দেওয়া।
তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, গোপনীয়তার নীতি এবং রোগীর সম্মতির প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কোনো তথ্য প্রকাশ বা অন্য কাজে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট অনুমতি ও বিধিবিধান বিবেচনা করাও জরুরি।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের আস্থা শুধু দ্রুত সেবা পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন প্রশ্ন
- স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর তথ্য ব্যবহারের প্রশ্নও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ ধরনের প্রযুক্তি চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ, প্রশাসনিক কাজ সহজ করা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। তবে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য কোনো ডিজিটাল টুলে ব্যবহারের আগে তার নিরাপত্তা, অনুমোদিত ব্যবহার এবং তথ্য সংরক্ষণের নীতি যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব বলেই সব তথ্য সব ব্যবস্থায় ব্যবহার করা উচিত—এমন নয়। কোন তথ্য প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন এবং সেটি নিরাপদে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা আগে বিবেচনা করতে হবে।
আমার দৃষ্টিতে, ভবিষ্যতের হাসপাতালগুলোকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনার নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার ওপরও বিনিয়োগ করতে হবে।
তথ্যের নিরাপত্তা নেতৃত্বেরও দায়িত্ব
- হাসপাতালের তথ্যের নিরাপত্তাকে শুধু আইটি বিভাগের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা, নার্সিং, প্রশাসন, মানবসম্পদ এবং রোগীসেবার বিভিন্ন প্রক্রিয়া যুক্ত।
প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে যে তথ্য ব্যবহারের নীতিমালা রয়েছে, দায়িত্বগুলো পরিষ্কার, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথভাবে জানানো এবং ঝুঁকি কমানোর প্রক্রিয়াও প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
ডিজিটাল রূপান্তর সফল হওয়ার জন্য তাই শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিকে নিরাপদভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতিও থাকতে হবে।
শেষ কথা
- স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল রূপান্তর মানুষের জন্য অনেক নতুন সুযোগ তৈরি করছে। চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়া, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এবং সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু এই অগ্রগতির কেন্দ্রে একজন মানুষ আছেন, যিনি নিজের সবচেয়ে ব্যক্তিগত তথ্যগুলোর একটি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে দিচ্ছেন।
তাই ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য শুধু কত দ্রুত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, কতগুলো ব্যবস্থা চালু হয়েছে কিংবা কত কাজ স্বয়ংক্রিয় করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। তথ্য কতটা নিরাপদ, দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষিত থাকছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতের শক্তিশালী হাসপাতাল হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি রোগীর গোপনীয়তা ও তথ্যের নিরাপত্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ করে তুলতে পারবে।
কারণ রোগী যখন চিকিৎসার জন্য নিজের তথ্য দেন, তখন তিনি শুধু একটি সেবা গ্রহণ করেন না। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও রাখেন।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রযুক্তি চিকিৎসাকে সহজ করার পাশাপাশি রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
লেখক : মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
