ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ড. আহাদ উল্লাহ ও প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ
“তোরা যে যা বলিস ভাই; আমার টাকার ভাগ আমি চাই।” নানা দুর্নীতি, অনিয়ম, ভাগাভাগি, হিসাবের দর কষাকষি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকৌশলীদের সরকার দলীয় লিয়াজোঁ রক্ষার অসম প্রতিযোগিতায় স্থবির হয়ে পড়েছে সওজের স্বাভাবিক কার্যক্রম। দুর্নীতি, অনিয়ম ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সড়ক ভবনসহ মোটামুটি সারাদেশের একই চিত্র হলেও নতুন করে যোগ হয়েছে প্রকৌশলীদের রাজনৈতিক লিয়াজোঁ রক্ষার অসম প্রতিযোগিতা। সরকার দলীয় রাজনৈতিক লিয়াঁজো রক্ষার অসম প্রতিযোগিতায় অনেক প্রকৌশলী নিজ দপ্তরের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ না করেই ধর্না দেওয়া প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দরবারে হাজিরা দিতে।
এমনকি রাজনৈতিক লিয়াজোঁ রক্ষায় প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্তও প্রকৌশলীদের দেখা যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক কার্যালয় কিংবা বাসভবনে যাতায়াত করতে। বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকৌশলীদের কেউ কেউ নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে বদলি বাণিজ্যে।
এর আগে যে কোনো স্টেশনে প্রকৌশলীদের সাধারণত পোস্টিং মেয়াদ দুই থেকে তিন বছর থাকলেও, বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনে বিভিন্ন জায়গায় বিপরীতমুখী নানা ধরনের নজির সামনে আসছে। ইতোমধ্যেই ন্যূনতম দুই-তিন বছর মেয়াদোত্তীর্ণের আগেই ময়মনসিংহ জোন, সিলেট সার্কেল ও নোয়াখালী সার্কেলের বদলি সওজে দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্যতম ড. আহাদ উল্লাহ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে সরাসরি আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার সাথে সাথেই সওজের স্বাভাবিক ২-৩ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণের আগেই কর্মজীবনের তার চাইতে সিনিয়র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আওয়ামী যুগের আরেক সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টির সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ও জি এম কাদেরের বোন জামাই হাফিজ উদ্দিনকে সরিয়ে রাতারাতি সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন নেন।
এদিকে, সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন হওয়ার পরপরই একই অঞ্চলে আহাদ উল্লাহর লিয়াজু ও ৩৫ লক্ষ টাকার আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তার দীর্ঘদিনের পরিচিত নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ বড়ুয়ার পদায়ন হয় পঞ্চগড় সড়ক বিভাগ হতে হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগে।
অভিযোগ রয়েছে আহাদ উল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় এখন বেশ দম্ভের সাথেই বলেন, যে ডন সে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সব আমলেই ডন। আমি শুধু এখন বিএনপির সিলেট অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করি না বরং পুরো সওজ নিয়ন্ত্রণ করি। অন্যদিকে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ও জি এম কাদেরের আপন বোন জামাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া সিলেট সার্কেল থেকে স্বাভাবিক মেয়াদের আগেই অপসারিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিন তার চাকরিজীবনে শুরুতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে বগুড়ায় পোস্টিং এর সময়ের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার তোলা ছবি বিভিন্ন মহলের দেখিয়েও হালে যেন পানি পাচ্ছে না।
নিয়মিত রাজনৈতিক লিয়াজোঁ রক্ষা ও আর্থিক লেনদেনে বেশ কিছু জায়গায় আবার দেখা যাচ্ছে এর উলটো চিত্র। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগীদের একজন হলেও সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ। ঢাকায় দুই বছরের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও আছেন বহাল তবিয়তে। যদিও ইতোমধ্যেই কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য সচিবালয়ে দৌঁড়ঝাঁপ ও নানা তদবির করেও ব্যর্থ হন। কুমিল্লা জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন পাওয়ার জন্য সচিবালয়ে আর্থিক ও রাজনৈতিক লিয়াজোঁর, ট্রাম কার্ড ছাড়লেও তার কার্ডের উপর বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সদ্য মানিলন্ডারিং-এর অভিযোগে অভিযুক্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলামকে নিয়ে এক কোটি ২০ লক্ষ টাকার ওভারট্রাম করেন বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলে রব্বে। ফজলে রব্বের কাছে ওভার ট্রাম-এ ধরাশায়ী হয়ে ইতোমধ্যেই আজাদ রক্ষণাবেক্ষণ উইং-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন পেতে শুরু করেছেন দৌঁড়ঝাঁপ।
স্বপ্ন দেখছেন অবসরের পর একদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কেউ প্রকৌশলী হিসেবে সম্বোধন না করে নেতা বলে সম্বোধন করলে বেশি খুশি হন। সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রাজনৈতিক লিয়াজোঁ রক্ষায় কমপক্ষে তিন থেকে চার কার্যদিবস-ই পড়ে থাকেন সচিবালয়ে। আবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাজিরা দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বাসভবন কিংবা রাজনৈতিক কার্যালয়ে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারে দুই হাতে খরচ করেন টাকা। কথিত আছে ঢাকা জোনে পদায়নের পর শুধুমাত্র তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের নিউজ অপসারণের জন্যই তিনি অদ্যাবধি খরচ করেছেন প্রায় অর্ধ কোটি টাকার উপড়ে। তার কর্মস্থলে অনিয়মিত উপসি্থতির সুযোগে স্থবির হয়ে পড়েছে ঢাকা জোনের সব স্বাভাবিক কার্যক্রম। একই চিত্র ময়মনসিংহ গোপালগঞ্জ রংপুর রাজশাহী বরিশাল সহ প্রায় সব জোন সার্কেলের।
একইভাবে আওয়ামী আমলের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ও সরাসরি আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে কয়েকবার বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সহ-সভাপতি হওয়া ও দুই বছরের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক লিয়াজোঁ রক্ষা করেন রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আমানুল্লাহ। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের দুইবারের সাবেক সভাপতি ও রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের বহাল তবিয়তে স্বস্থানে বহাল থাকা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগ আমলের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ও প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আছেন সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ভবিষ্যৎ চিফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর নারায়নগঞ্জের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুদ্দিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম, নোয়াখালীর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলিউল, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তরফদার, রাঙামাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহিদ, ঢাকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তরফদার, দিনাজপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিন, কুমিল্লার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোফাজ্জল হায়দার ও পাবনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দার।
লোভনীয় পদায়ন ও নিজ স্বার্থে নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে প্রতিনিয়ত নিজ দপ্তরে অনুপস্থিত থাকায় তাই ব্যাহত হচ্ছে সওজের স্বাভাবিক কার্যক্রম। অনেকেই আবার প্রতিনিয়ত সচিবালয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দপ্তরে যাতায়াতের কারণে নিজের ব্যক্তিগত কিংবা সরকারি বাসভবনকে বানিয়ে নিয়েছে অফিস। দেশব্যাপী প্রায় সব জোন সার্কেলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের এহেন অনিয়মিত-এর সুযোগে অন্যান্য সিভিল কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে বেড়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রবণতা। স্থবির হয়ে পড়ছে সড়কের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আগে বছরের এই সময়ে একেকটি জোনে ১৫ থেকে ২০ টি দরপত্র হত এবং এই ১৫ থেকে ২০টি দরপত্র আমরা সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ইভোলিউশন করে প্রধান প্রকৌশলী মহোদয়ের দপ্তরে পাঠিয়ে দিতাম, এক থেকে সর্বোচ্চ দুই দিনের মধ্যে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর হতে মন্ত্রণালয়ে এই ইভিলেশনগুলো চলে যেত। সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই ঠিকাদার নির্ধারণ করে কার্যাদেশ দিয়ে দেওয়া হতো। অর্থাৎ একটি দরপত্র ওপেনিং-এর পর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২৫ দিনের মধ্যেই ঠিকাদার ওয়ার্ক অর্ডার পেয়ে যেতেন। আর এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে চার মাস থেকে এমন কি ছয় মাসও লাগে। কারণ আমাদের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী স্যারেরা নিয়মিত অফিস করেন না। তারা সবাই সড়ক ভবন ও মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকেন।
তিনি বলেন, এখন তো এমনও হয় তিন মাস হয়ে গেলেও আমরা কোন দরপত্রের ইভল্যুয়েশন জোন থেকে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠাতে পারি না। কারণ স্যারদের কোন এগুলো নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। এক একটি বিল বা যে-কোনো ধরনের ডকুমেন্টেশন আগে যা সর্বোচ্চ একদিনে সমাধান হয়ে যেত এখন দেখা যায় তা ১৫ দিনেও সমাধান হয় না। বাধ্য হয়ে আমাদের প্রায়শই স্যারদের বাসায় গিয়ে এগুলো সিগনেচার করিয়ে আনতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে সওজ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে। ভবিষ্যতে কোন ঠিকাদারও পাওয়া যাবে না এই ডিপার্টমেন্টে।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবুল কালাম আজাদের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এটি আমাদের ডিপার্টমেন্টাল বিষয় এ নিয়ে গণমাধ্যমে আমি কোন বক্তব্য দিতে চাই না।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি। দেখা মেলেনি অফিসে যেয়েও।
