বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পশুপাখি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক নজিরবিহীন গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক কোম্পানি কলোসাল বায়োসায়েন্স।
ডাইনোসর যুগের সিনেমার মতো মনে হলেও বিষয়টি যেন কেবল বিনোদন নয়, বরং বাস্তব পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার এক বৈজ্ঞানিক লড়াই সে কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী।
উলি ম্যামথ (প্রাচীন বিশালাকার হাতি) ও ডায়ার উলফের (বিলুপ্ত মাংসাশী নেকড়ে) মতো বিলুপ্ত প্রাণী পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য কলোসাল বায়োসায়েন্সের প্রয়াসকে প্রায়শই ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
গেল সপ্তাহে প্রযুক্তি সম্মেলনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কলোসালের প্রধান নির্বাহী ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেন ল্যাম বলেছেন, এসব তুলনায় তিনি একেবারেই কিছু মনে করেন না।
“আমার মনে হয় নব্বইয়ের দশকে যারা জুরাসিক পার্ক সিনেমাটি দেখেছেন আর বলেছেন যে এটা আহামরি কিছু ছিল না, তারা আসলে খুব একটা রসিক মানুষ নন! হ্যাঁ, আমি সিনেমাগুলো দেখেছি। আমার দারুণ লেগেছে। এগুলো আমাদের বিনোদন দিয়েছে, আবার ভয়ও পাইয়েছে।
“আমাকে বারবার মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হয়, ওগুলো কেবলই সিনেমা ছিল। আমি মনে করি না জুরাসিক পার্কের গল্পে প্রকৃতি সংরক্ষণ বা মানবকল্যাণের কোনো মডেল ছিল। ফলে আমরা সিনেমা থেকে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ শুরু করেছি।”
বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে, বর্তমানে কার্যকর কোনো ডাইনোসরের ডিএনএ অবশিষ্ট না থাকায় ডাইনোসর ফিরিয়ে আনা বাস্তবে অসম্ভব। তবে ডায়ার উলফ ও উলি ম্যামথ প্রজেক্টের পাশাপাশি কলোসাল বর্তমানে ডোডো পাখি, তাসমানিয়ান টাইগার ও নিউজিল্যান্ডের বিলুপ্ত দানবীয় ‘মোয়া’ পাখিসহ আরও কিছু প্রাণী জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ল্যাম বলেছেন, “খুব সম্ভবত আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে মানুষ হারিয়ে যাওয়া বেশ কিছু প্রাণীকে আমাদের হাত ধরে পৃথিবীতে ফিরে আসতে দেখবে। আমাদের খামারে আরও ডায়ার উলফের জন্ম হতে পারে।”
কয়েক শত বছর পুরনো মাথার খুলি ও দাঁত থেকে জিনগত উপাদান সংগ্রহ করে ডায়ার উলফের ছানা তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।
এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল ব্যবহার করে কলোসাল সেই প্রাচীন ডিএনএ দিয়ে ডায়ার উলফের জিনোম নতুন করে সাজায় এবং এর সঙ্গে বর্তমানের সবচেয়ে নিকটতম প্রজাতি ‘ধূসর নেকড়ে’র (গ্রে উলফ) জিনোম মিলিয়ে দেখে।
পরবর্তীতে আধুনিক ধূসর নেকড়ের কোষ পরিমার্জন করে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। সবশেষে গৃহপালিত কুকুরকে সারোগেট মাদার হিসেবে ব্যবহার করে ‘রোমুলাস’, ‘রেমাস’ ও ‘খালেসি’ নামে তিনটি ডায়ার উলফ ছানার জন্ম দেওয়া হয়েছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, কলোসাল প্রকৃতপক্ষে ডায়ার উলফকে ফিরিয়ে আনেনি, বরং তারা কেবল জিনগতভাবে পরিবর্তিত বা জিএমও ধূসর নেকড়ে তৈরি করেছে।
সমালোচকদের দাবিকে ‘শব্দচয়ন নিয়ে তর্ক’ বলে উড়িয়ে দিয়ে ল্যাম বলছেন, “এ ধরনের বিতর্ক মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। আসলে আজকের ধূসর নেকড়েগুলোও জিনগতভাবে পরিবর্তিত ডায়ার উলফ ছাড়া কিছুই নয়। পার্থক্য কেবল একটাই, সেই পরিবর্তনটি করেছিল প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা, আর এটা করছে বিজ্ঞান।”
একই প্রক্রিয়ায় এশিয়ান হাতিকে জিনগতভাবে রূপান্তরের মাধ্যমে ‘উলি ম্যামথ’ প্রজেক্টের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে কলোসাল।
অগাস্টে টাইম’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ল্যাম বলেছেন, ২০৩০-এর দশকে একটি উলি ম্যামথের জন্ম দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কোম্পানিটি।
“আমরা একে উলি ম্যামথই বলছি। কারণ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, এটা যদি দেখতে হাঁসের মতো হয়, হাঁসের মতো ডাক দেয় ও হাঁসের মতোই বাস্তুতাত্ত্বিক ভূমিকা রাখে তবে এটা নিশ্চিতভাবেই একটি হাঁস।”
২০১৯ সালে হার্ভার্ডের জনপ্রিয় জিনপ্রকৌশলী জর্জ চার্চের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হন ল্যাম। ড. চার্চ সিন্থেটিক বায়োলজির অন্যতম রূপকার হিসেবে বিবেচিত।
‘পার্সোনাল জিনোম প্রজেক্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. চার্চ ২০২১ সালে সিএনবিসিকে বলেছিলেন, বেশ কয়েক দশক ধরেই তিনি উলি ম্যামথকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখে আসছেন।
তবে উলি ম্যামথকে ফিরিয়ে আনার এই ভাবনার লক্ষ্য কেবল বিলুপ্ত প্রাণীদের নিয়ে কোনো বাস্তবভিত্তিক ‘জুরাসিক পার্ক’ তৈরি করাতেই সীমিত নয়, এর উদ্দেশ্য আরও সুদূরপ্রসারী।
ল্যাম বলেছেন, “ড. চার্চের স্বপ্ন ছিল যে আমরা ‘ক্রিসপার’সহ এসব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিলুপ্ত প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনব, এসব প্রযুক্তি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কাজে লাগাব ও জীবনকে নতুন করে প্রোগ্রাম করার এমন মডেল তৈরি করব, যা পৃথিবীর নানা দরকারি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব।”
এসব দরকারী প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে পরিবেশ ও প্রজাতি সংরক্ষণের সেসব সুবিধা, যা বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। যেমন, জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড উলি ম্যামথ তুষারাবৃত সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চলে হেঁটে হেঁটে বরফের স্তরকে চ্যাপ্টা করে দেবে, যা মাটিকে কঠিন তুষারাবৃত রাখতে সাহায্য করবে।
কয়েক শত বছর পুরনো মাথার খুলি ও দাঁত থেকে জিনগত উপাদান সংগ্রহ করে ডায়ার উলফের ছানা তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। ছবি: কলোসাল বায়োসায়েন্সেস
পাশাপাশি, এরা গাছপালা ভেঙে ফেলে তাপ-শোষণকারী জঙ্গলকে তৃণভূমিতে রূপান্তর করবে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
ল্যাম বলেছেন, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার এ পুরো গবেষণা জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিচ্ছে।
এটা সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অনুজীব গবেষণা, নতুন জিন থেরাপি, মানুষের দেহে সুনির্দিষ্টভাবে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে বংশগত রোগ পুরোপুরি নির্মূলের ক্ষেত্রগুলোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
ল্যাম বলেছেন, ডিএনএ সংশ্লেষণের এ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে দ্রুতবর্ধনশীল ফসল বা গাছপালা উৎপাদনেও সাহায্য করবে।
“আমরা বড় আকারের ডিএনএ প্যাকেজ তৈরির মাধ্যমে ডিএনএ সংশ্লেষণের সর্বোচ্চ সীমানাকে নতুন করে রূপ দিচ্ছি, যা ‘প্রোগ্রামযোগ্য জীবন’ সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত চিন্তাধারাকে পুরোপুরি বদলে দেবে।”
কলোসাল থেকে জন্ম নেওয়া ‘অ্যাস্ট্রোমেক’ নামের এক সহযোগী কোম্পানি কাজ করছে ‘কনভারজেন্ট ইভোলিউশন’ নিয়ে।
প্রায় সবদিক দিয়ে একই রকম দেখতে হওয়ার পরও কেন বিভিন্ন প্রজাতির রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা আলাদা হয় বা কেন কিছু প্রজাতির ক্যান্সার হওয়ার হার মানুষের চেয়ে বহু গুণ কম (যেমন হাতিদের কেন ক্যান্সার খুব কম হয়) সেসব রহস্য উদ্ঘাটন করছে তারা।
ল্যাম বলেছেন, এ গবেষণার ফলাফল মানুষের জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান ও ভবিষ্যতের মহামারি ঠেকানোর কাজে লাগানো যেতে পারে। ‘ডি ম্যাগাজিন’-এর তথ্য অনুসারে, গত মার্চেই অ্যাস্ট্রোমেকের বাজারমূল্য ২০০ কোটি ডলার পেরিয়েছে।
“আমরা বর্তমানে জীববৈচিত্র্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এসব প্রযুক্তিগত হাতিয়ার প্রয়োজন। কারণ আগামী ২৫ বছরের মধ্যে আমরা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জীববৈচিত্র্য হারাতে বসেছি।
“ফলে ক্রায়োপ্রিজারভেশন (অতি-শীতল তাপমাত্রায় টিস্যু সংরক্ষণ), বায়োব্যাংক ও জিনগত উদ্ধার অভিযানের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
“এটা গবেষণার এমন এক দুয়ার খুলে দিচ্ছে, যেখানে আমরা বিবর্তনীয় ধারা ও মডেলগুলো বিশ্লেষণ করে তা অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি তা ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে মানুষের স্বাস্থ্যসেবাসহ আরও বহু জায়গায় সুনির্দিষ্ট বিবর্তন ঘটানোর কাজই হোক না কেন।”
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটগুলো ঠেকানোর এসব উদ্যোগ কলোসাল বায়োসায়েন্সকে বিনিয়োগকারীদের কাছেও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
জুলাইয়ে কোম্পানিটি ‘টিডব্লিউজি গ্লোবাল’-এর নেতৃত্বে ২০ কোটি ডলারের ‘সিরিজ সি’ অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে কোম্পানিটির বাজারদর দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০ কোটি ডলারে।
চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত কোম্পানিটি সর্বমোট ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। বিলুপ্ত প্রাণীদের ফিরিয়ে আনার ধারণা মানুষকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে তা ল্যামের চোখ এড়ায়নি।
ল্যাম বলেছেন, তাদের মোট বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৩০ শতাংশই কোম্পানিটির বিষয়ে জানতে পেরেছেন ‘তাদের সন্তানদের মাধ্যমে’।
“আমরা যদি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত, তাদের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে ও এমন সিন্থেটিক বায়োলজি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারি, যা নানাবিধ কাজে লাগানো যাবে তবে সেটাই হবে আমাদের আসল সাফল্য।
“কারণ, আমাদের সন্তানেরাই তো আমাদের তৈরি করা বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়বে এবং সিদ্ধান্ত নেবে যে সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়।”
