মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও পুলিশ কিংবা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেই কেন সংঘটিত হচ্ছে মারধর, গণপিটুনি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনা? ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে জনবলের সংকট কতটা প্রকট এবং এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র ও সরকারের কি কোনো দ্বায়বদ্ধতা নেই? নাগরিকদের মনে দীর্ঘদিন ধরেই এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন করা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাষ্ট্রে পুলিশ থাকার প্রধান উদ্দেশ্য শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা নয়; বরং অপরাধ প্রতিরোধ, মানুষের জীবন রক্ষা, সহিংসতা থামানো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কোনো কোনো ঘটনায় যখন পুলিশের চোখের সামনেই একজন মানুষকে মারধর করা হয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কেউ কাউকে পেটাতে থাকে, কিংবা প্রকাশ্যে কাউকে অপমান ও শাস্তি দেওয়া হয়Ñ আর উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেন নাÑ তখন প্রশ্ন ওঠে, পুলিশ কি যথেষ্ট জনবল ও সক্ষমতার অভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে অনীহা, সিদ্ধান্তহীনতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ কাজ করছে?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা কয়েকটি ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ঢাকার ধানমন্ডিতে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় পুলিশের উপস্থিতি এবং তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ না করার অভিযোগ; রংপুরের তারাগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর সময় পুলিশের ঘটনাস্থলে গিয়েও ফিরে আসার খবরÑ এসব ঘটনা শুধু কয়েকজন পুলিশ সদস্যের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এগুলো পুলিশি জবাবদিহি, রাষ্ট্রের সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
অল্প কদিন আগেই ঢাকার ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কে বাংলাদেশ আই হাসপাতালের বিপরীতে ফুটপাতে শাহিদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ নামের ৪৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন গণ্যম্যাধমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ বছর বয়সি এক নারী ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শের অভিযোগ করেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওই ব্যক্তিকে চড়-লাথি মারতে দেখা যায়। ভিডিওতে ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিও দেখা যায়; তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন, এমন দৃশ্য ফুটেজে দেখা যায়নি।
এখানে পুলিশের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে নেওয়া, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পুলিশের সামনে মারধর চলতে থাকলে এবং পুলিশ কার্যকর হস্তক্ষেপ না করলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন ওঠেÑ ঘটনাটি থামানোর জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? তবে কোনো একটি ভিডিও দেখে পুলিশ সদস্যদের সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা যায় না। তাদের কাছে কী তথ্য ছিল, কোনো তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা ছিল কি না, কিংবা তারা অন্য কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি নাÑ এসব তদন্তের বিষয়। কিন্তু দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং ফল প্রকাশ করা জরুরি।
অন্যদিকে তারাগঞ্জে জনতার গণপিটুনিতে দুজনের মৃত্যু হয়; ধানমন্ডিতে একজন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় পুলিশের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে: পুলিশ উপস্থিত থাকলে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না? পুলিশের দায়িত্ব শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা নয়। কোথাও সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হলে তা শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি রাখাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ।
চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর একটি ইংরেজি প্রত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকায় সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে পুলিশের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে কয়েকটি সমস্যার কথা উঠে আসেÑ পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাহিনীর মধ্যে থেকে যাওয়া ভয়, ঘন ঘন বদলি, নতুন কর্মস্থলে কর্মকর্তাদের স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে সীমিত ধারণা, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিণতি নিয়ে সংশয়। এগুলো পুলিশের পক্ষ থেকে উঠে আসা ব্যাখ্যা। তাই এগুলোকে সব ঘটনা বা সব পুলিশ সদস্যের আচরণের সর্বজনীন কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। কিন্তু এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন সামনে আনে।
প্রশ্ন হলো, উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী করেছেন, কী করতে পারতেন এবং কেন তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি। তারাগঞ্জের ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফিরে আসার যে বিবরণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা দেখায় যে জনবল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৯ ধারায় পুলিশ কর্মকর্তাদের আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধে হস্তক্ষেপ করার এবং তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এমন অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। ১৫০ ও ১৫১ ধারায় অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এবং নির্দিষ্ট শর্তে অপরাধ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তারের বিষয়ও রয়েছে। এর অর্থ, পুলিশকে শুধু অপরাধের পর তদন্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি; অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হতে হবে। পুলিশের শক্তি প্রয়োগ হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জনতা নিয়ন্ত্রণের নামে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আক্রান্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করার মতো পরিস্থিতিতে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। সুতরাং দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে দুটি বিষয় পাশাপাশি দেখতে হবেÑ পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে কি না এবং নেওয়া পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল কি না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পুলিশকে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল দেওয়া এবং পুলিশের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু সরকার বা সরকারি দলের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে দলীয় নেতারা পুলিশের দৈনন্দিন তদন্ত, গ্রেপ্তার কিংবা মাঠপর্যায়ের আইন প্রয়োগে ব্যক্তিগত নির্দেশ দেবেন।
যেকোনো ঘটনা ঘটার পরে আলোচনা সমলোচনা হলেই কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া মানেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। একইভাবে তদন্ত শুরু হওয়াই চূড়ান্ত জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ নয়। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত; ঘটনাস্থলের ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও যোগাযোগের নথি পর্যালোচনা; সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার লিখিত বিবরণ; অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে প্রমাণ বিবেচনা; তদন্তের ফল অনুযায়ী আনুপাতিক ও আইনসম্মত ব্যবস্থা; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচার; ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।
শেষ পর্যন্ত নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনো একটি বাহিনীর ভাবমূর্তির চেয়ে বড়। পুলিশ, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানÑসবাইকে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে অভিযোগের তদন্ত হবে, সহিংসতা প্রতিরোধ করা হবে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই উৎসাহিত হবে না। কারণ একটি রাষ্ট্রে পুলিশের প্রকৃত সক্ষমতা শুধু কতজন সদস্য আছে, তা দিয়ে নয়Ñ বিপদের মুহূর্তে নাগরিকের জীবন রক্ষায় তারা কতটা প্রস্তুত, আইন কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে এবং ব্যর্থ হলে কতটা জবাবদিহি করেÑ তা দিয়েও বিচার করা হয়।
