মাঠজুড়ে চলছে ব্যস্ততা। কেউ জমি তৈরি করছেন, কেউ সার ছিটাচ্ছেন, আবার কেউ মাটির বুকে যতœ করে রোপণ করছেন বীজ আলু। ভালো দাম আর বাড়তি মুনাফার আশায় জয়পুরহাটের কৃষকেরা নেমেছেন আগাম আলু চাষে। তাদের চোখেমুখে নতুন ফসল ঘিরে আশার ঝিলিক। তবে সেই আশার আড়ালেই রয়েছে লোকসানের শঙ্কা। গত মৌসুমের অবিক্রীত আলুর মজুত, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কায় আগাম আলু চাষ নিয়ে সতর্ক করছে কৃষি বিভাগ।
চলতি মৌসুমে জয়পুরহাট জেলায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলার কালাই, ক্ষেতলাল ও সদর উপজেলার বিভিন্ন মাঠে এখন চলছে আলু রোপণ ও পরিচর্যার কর্মযজ্ঞ।
আগাম আলুতে বাড়তি লাভের স্বপ্ন
আমন ধান কাটার পর কিংবা জলাবদ্ধতামুক্ত উঁচু জমিতে আগাম আলু চাষ করছেন কৃষকেরা। সাধারণত ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এসব আলু তুলে বাজারজাত করা যায়। মৌসুমের শুরুতে বাজারে আলুর সরবরাহ কম থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই আগাম আলু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন তারা। কৃষকদের অভিজ্ঞতা বলছে, ভরা মৌসুমে বাজারে আলুর সরবরাহ বেড়ে গেলে অনেক সময় উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু আগাম আলু বাজারে তুলতে পারলে চাহিদা ও দামÑদুটিই অনুকূলে থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাই কিছুটা বেশি খরচ হলেও বাড়তি মুনাফার আশায় আগাম জাতের আলু চাষ করছেন অনেকে। জয়পুরহাটের কৃষিপ্রধান জনপদে এই চাষ এখন সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। তবে কাক্সিক্ষত লাভ পেতে আবহাওয়া, ফলন ও বাজারদরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের।
মাঠে ব্যস্ততা, মনে দুশ্চিন্তা
আগাম আলু চাষ ঘিরে কৃষকেরা যখন ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। কারণ, গত মৌসুমের আলুর বড় একটি অংশ এখনো অবিক্রীত রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার, শ্রমিকের মজুরি ও সংরক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির চাপ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জু আলম সরকার জানান, এ বছর জয়পুরহাটের ২২টি কোল্ড স্টোরেজে এখনো গত বছরের প্রায় ৫০ শতাংশ আলু মজুত রয়েছে। এ অবস্থায় আগাম জাতের আলু চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছে কৃষি বিভাগ।
তিনি বলেন, গত মৌসুমে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। শ্রমিকের মজুরি, হিমাগার ভাড়া ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এর সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়া যুক্ত হওয়ায় কৃষকদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ফলন ভালো হলেই কি মিলবে কাক্সিক্ষত দাম?
জয়পুরহাটে মূলত গ্রানোলা, কার্ডিনাল ও দেশি জাতের আগাম আলু চাষ হয়ে থাকে। ভালো ফলনের আশায় কৃষকেরা জমি তৈরি থেকে শুরু করে সার প্রয়োগ ও বীজ রোপণে যতœ নিচ্ছেন। রোগবালাই প্রতিরোধ এবং উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে তদারকি করা হচ্ছে।
তবে ভালো ফলনই যে লাভ নিশ্চিত করবে, এমন নয়। উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং বাজারে চাহিদা বজায় থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গত বছরের বিপুল পরিমাণ আলু এখনো হিমাগারে থাকায় নতুন আলু বাজারে আসার সময় দাম কেমন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রপ্তানি বাড়লে খুলতে পারে সম্ভাবনার দুয়ার
কৃষি বিভাগের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে নির্ধারিত ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম আলুর ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে কৃষকদের লোকসান এড়াতে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও আলু রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জু আলম সরকারের মতে, বিদেশে আলু রপ্তানি বাড়ানো গেলে দেশের বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে এবং কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। সব মিলিয়ে জয়পুরহাটের মাঠে এখন আগাম আলু ঘিরে আশা ও শঙ্কা পাশাপাশি চলছে। কৃষকেরা স্বপ্ন দেখছেন ভালো ফলন ও বাড়তি আয়ের,
আর কৃষি বিভাগ ভাবছে উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে। শেষ পর্যন্ত আগাম আলুর এই সবুজ মাঠ কৃষকের ঘরে কতটা সচ্ছলতা এনে দেবে, তা নির্ভর করবে আবহাওয়া, বাজারদর ও কার্যকর বিপণন ব্যবস্থার ওপর।
লেখক : জয়পুরহাট প্রতিনিধি
