মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
আমরা সাধারণত অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যাই। শরীরে কোনো সমস্যা দেখা দিলে পরীক্ষা করাই, রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসা শুরু করি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অসুস্থ হওয়ার আগেই যদি ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা যেত, তাহলে কি অনেক ক্ষেত্রে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতো? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় এ প্রশ্নটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য শুধু অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা নয়; মানুষকে যতা সম্ভব সুস্থ রাখা, রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করাও এর অংশ। আমার দৃষ্টিতে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া মানে চিকিৎসার বিকল্প তৈরি করা নয়; বরং মানুষকে অসুস্থতা মোকাবিলার পাশাপাশি সুস্থতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা, নাকি ঝুঁকি আগে শনাক্ত করা: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময়মতো ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক সময় এসব সমস্যার প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। ফলে মানুষ নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন না-ও থাকতে পারেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে কিছু রোগ বা ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব। তবে সব মানুষের জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাপন, পূর্ববর্তী অসুস্থতা এবং অন্যান্য ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা নির্বাচন করা উচিত। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোই শেষ কথা নয়। পরীক্ষার ফল বুঝতে পারা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসা শুরু করা এবং পরবর্তী পরিচর্যা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত মূল্য তৈরি হয় তখনই, যখন ঝুঁকি শনাক্তকরণের পর মানুষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বও বাড়ছে। অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। একজন মানুষের উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে, হৃদ্রোগের ঝুঁকি বোঝার জন্য ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি মানুষ ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করেন, তাহলে কিছু রোগের জটিলতা প্রতিরোধ বা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এখানে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে-অনেক মানুষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা ভাবেন তখনই, যখন কোনো উপসর্গ দেখা দেয়। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে এই অভ্যাসে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
সচেতনতা শুধু তথ্য দেওয়ার বিষয় নয়: প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার প্রথম ধাপ হলো মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া। কিন্তু স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য প্রকাশ করলেই মানুষ আচরণ পরিবর্তন করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একজন মানুষ জানেন যে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম উপকারি, কিন্তু ব্যস্ততা, কাজের পরিবেশ বা উপযুক্ত জায়গার অভাবে তিনি তা করতে পারেন না। কেউ জানেন যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু খরচ, সময় কিংবা কোথায় যাবেন-এসব অনিশ্চয়তার কারণে পিছিয়ে দেন। তাই সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সেবায় পৌঁছানো সহজ করাও জরুরি। স্বাস্থ্য যোগাযোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে ভয় দেখানো নয়; বরং তার ঝুঁকি বোঝা, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। ভালো স্বাস্থ্য যোগাযোগ মানুষকে শুধু সচেতন করে না; পরবর্তী পদক্ষেপটি বুঝতেও সাহায্য করে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য যোগাযোগের নতুন সুযোগ: বর্তমানে মানুষ অনলাইন সার্চ, হাসপাতালের ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল ভিডিওর মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য খুঁজছেন। এই প্রবণতা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি, হৃদ্স্বাস্থ্য, ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিয়ে তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিটি কনটেন্টের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হওয়া উচিত নয়। তথ্যটি নির্ভরযোগ্য কি না, সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারছেন কি না এবং সেটি তাদের জন্য উপযোগী পরবর্তী পদক্ষেপ নির্দেশ করছে কি না- এসবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। কোনো পরীক্ষা বা চিকিৎসা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত দাবি করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভয় তৈরি করাও এড়িয়ে চলা জরুরি।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতালের দায়িত্ব নয়: রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভ্যাস, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের সম্পর্ক রয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, তামাক পরিহার, প্রয়োজনীয় টিকাদান এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা-এসব বিষয়ে মানুষকে সহায়তা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সহজপ্রাপ্যতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ এবং শনাক্ত হওয়া সমস্যার ধারাবাহিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়, তাহলে শুধু স্ক্রিনিং বাড়িয়ে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে। এখানে হাসপাতালগুলোর ভূমিকা হলো চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্যশিক্ষা, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য কীভাবে বুঝব: শুধু কতজন মানুষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেন, কতটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান হলো কিংবা কতজন একটি পোস্ট দেখলেন-এসব দিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সম্পূর্ণ সাফল্য বোঝা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছেছে কি না, উপযুক্ত স্ক্রিনিংয়ের পর প্রয়োজনীয় ফলো-আপ হয়েছে কি না এবং শনাক্ত হওয়া সমস্যার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়েছে কি না। দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির নিয়ন্ত্রণ, রোগের জটিলতা এবং মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। অর্থাৎ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য শুধু বেশি পরীক্ষা করানো নয়; সঠিক মানুষের জন্য সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
শেষ কথা: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং জটিল চিকিৎসার সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাশাপাশি এমন একটি স্বাস্থ্যসংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি, যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থতার ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও সচেতন থাকবেন। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সব রোগ ঠেকাতে পারে না, আর সব রোগের আগাম শনাক্তকরণও সম্ভব নয়। তবু উপযুক্ত ক্ষেত্রে সচেতনতা, টিকাদান, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং এবং সময়মতো চিকিৎসা মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমার বিশ্বাস, স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত-আমরা কত ভালোভাবে রোগের চিকিৎসা করছি, তার পাশাপাশি কত মানুষকে ঝুঁকি বুঝতে এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে পারছি। কারণ স্বাস্থ্যসেবার উদ্দেশ্য শুধু অসুস্থতার সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়। মানুষকে যতা সম্ভব সুস্থ থাকতে সাহায্য করাও স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬
