রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক। চারপাশে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা আর ব্যক্তিগত গাড়ির ছুটে চলা। যানজট, হর্ন আর মানুষের ব্যস্ততায় প্রতিদিনের ঢাকার পরিচিত দৃশ্য। এর মধ্যেই হঠাৎ চোখে পড়ে ভিন্ন এক বাহন—ঘোড়ার গাড়ি। ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে, সামনে বসা যাত্রীরা দেখছেন রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য। আধুনিক নগরের ব্যস্ততার মধ্যে বাহনটি যেন অতীতের কোনো ছবি।
পুরান ঢাকার সদরঘাট থেকে গুলিস্তানমুখী সড়কে এখনো চলে ঘোড়ার গাড়ি। অনেকে এটিকে টমটম বলে। একসময় যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই টমটমের ব্যবহার এখন বদলে গেছে। এখন অনেকেই এতে ওঠেন শখে, পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করতে কিংবা ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার জন্য। অন্যদিকে, যারা গাড়ি চালান বা মালিক হিসেবে ব্যবসাটি ধরে রেখেছেন, তাদের কাছে এটি প্রতিদিনের আয়ের উৎস।
বিজ্ঞাপন
ঐতিহ্যবাহী এই বাহন টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ, আর্থিক প্রণোদনা ও সুনির্দিষ্ট রুট পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।

গন্তব্যের চেয়ে আনন্দটাই বড়
ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার অভিজ্ঞতা অন্য বাহনের চেয়ে আলাদা। এখানে যাত্রীদের কাছে গন্তব্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি যাত্রাপথ উপভোগ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সামনে বসে চারপাশ দেখেন, কেউ অনুভব করেন পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যের স্পর্শ।
বিজ্ঞাপন
যাত্রী সবির চন্দ্র বলেন, ঘোড়ার গাড়ি দেখতে সুন্দর এবং ঐতিহ্যবাহী। এই ঐতিহ্যের টানেই তিনি গাড়িতে উঠেছেন।
যাত্রার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাড়িতে বসে তার খুব ভালো লাগছে। কোনো ঝামেলা ছাড়াই আরাম করে যাচ্ছেন।
যাত্রী হানিফের কাছেও ঘোড়ার গাড়িতে চড়া মনের শখ। গুলিস্তানে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠেছেন তিনি। অন্য বাহনে গেলে হয়তো কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যেত, কিন্তু ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার আনন্দ আলাদা।
বিজ্ঞাপন

হানিফ বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই সড়কে ঘোড়ার গাড়ি চলতে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করতে গিয়ে বাহনটির উপস্থিতি তার চোখে পড়েছে। এখনো গাড়ি চলছে দেখে ভালো লাগে। তবে এটি আর কত দিন থাকবে, তা নির্ভর করছে যারা এর দায়িত্বে আছেন, তাদের উদ্যোগের ওপর।
যাত্রী আব্দুল্লাহর কাছেও ঘোড়ার গাড়িতে চড়া আনন্দের বিষয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে কিংবা মন ফুরফুরে থাকলে তিনি এতে ওঠেন। ব্যস্ততা থাকলে অবশ্য অন্য বাহন বেছে নেন। তার কাছে ঘোড়ার গাড়ি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ।
বিজ্ঞাপন
আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সময় একটু বেশি লাগলেও আমার সমস্যা নেই। সামনে বসে সবকিছু দেখতে পারছি। এটাই একটা মজা।’
যাত্রী ফজল করিমের মতে, ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার মধ্যে একধরনের রাজকীয় অনুভূতি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ ঘোড়ার গাড়ির কথা শুনলেও আধুনিক সময়ে এসে তা দেখার বা চড়ার সুযোগ সবার হয় না। ঢাকায় এসে অনেকে শখ করে এই গাড়িতে ওঠেন।
যাত্রীদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার ক্ষেত্রে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে শখ, প্রশান্তি ও ঐতিহ্যের আকর্ষণই বড় হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
সদরঘাট থেকে গুলিস্তানমুখী পথে ঘোড়ার গাড়ির ভাড়া ৩০ টাকা বলে জানিয়েছেন যাত্রী আব্দুল্লাহ। তার দাবি, ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও একই ভাড়া দিতেন। তবে এই ভাড়া সব গাড়ি ও রুটে একই কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এক যুগ ধরে গাড়ি চালান নাসির
যাত্রীদের কাছে ঘোড়ার গাড়ি আনন্দের বাহন হলেও চালক মোহাম্মদ নাসিরের কাছে এটি জীবিকার লড়াই। এক যুগের বেশি সময় ধরে সদরঘাট এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যাওয়ার মতো দক্ষতা তার নেই।
নাসিরের মতে, মানুষের মধ্যে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার শখ যত দিন থাকবে, তত দিন এই বাহন টিকে থাকার সুযোগ থাকবে। তারা পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই কাজ করে সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
নাসির জানান, দৈনিক ৬০০ টাকা হাজিরায় কাজ করেন তিনি। কিন্তু এই টাকা দিয়ে সংসার চালানো যায় না।
তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের মতো চালকদের দিকে একটু নজর দেয়, তাহলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি তাদেরও তো পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন

আয় আছে, লাভ কতটুকু?
ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসায় প্রতিদিন আয় হলেও ব্যয়ের চাপ কম নয়। চালক ও সহকারীর পারিশ্রমিক, ঘোড়ার খাবার, পরিচর্যা এবং চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশই শেষ হয়ে যায়।
সিটি টমটম সার্ভিসের মালিক মো. মানিক বলেন, লোকসান হলেও তারা ব্যবসাটি টিকিয়ে রেখেছেন। কারণ, এটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ।
মানিকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কোনো দিন একটি গাড়ি থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা আয় হয়। কোনো দিন আয় ২ হাজার টাকায়ও পৌঁছায়। তবে এই অর্থের পুরোটাই মালিকের হাতে থাকে না।
তার হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৮০০ টাকা আয় হলে চালকের হাজিরা ৬০০ টাকা, ঘাস ও ভুসিতে খরচ ৯০০ টাকা। বাকি থাকে মাত্র ৩০০ টাকা, যা গাড়ির মালিকের অংশ। তবে ঘোড়ার চিকিৎসা, গাড়ির মেরামত ও অন্যান্য খরচ হিসাব করলে প্রকৃত লাভ আরও কমতে পারে।
বৃষ্টি হলে গাড়ি চালানো যায় না। অতিরিক্ত রোদেও কাজ ব্যাহত হয়। ঘোড়া অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়। ঘোড়া মারা গেলে নতুন ঘোড়া কেনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়।
মানিক জানান, একটি ঘোড়া কিনতে এখন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাগে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের এলাকায় প্রায় ৩২টি ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। ব্যবসায়ী আছেন ২২ থেকে ২৩ জন; কারও একাধিক গাড়িও রয়েছে।

শুধু যাত্রী নয়, বিয়ে-শাদিতেও আয়
নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বিয়ে-শাদি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপনের কাজেও ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। সরকারি দপ্তরের বার্ষিক অনুষ্ঠানেও কখনো কখনো এসব গাড়ি নেওয়া হয় বলে জানান মানিক।
তবে এসব কাজ নিয়মিত পাওয়া যায় না। ফলে শুধু যাত্রী পরিবহনের আয়ের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন।
মানিক বলেন, ‘আমাদের এই ব্যবসায় লোকসান খেয়েও টিকিয়ে রাখছি। কারণ, এটা একটা ঐতিহ্য। পুরান ঢাকার চারশ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকার যদি আমাদের দিকে একটু সুদৃষ্টি দেয়, কিছু প্রণোদনা দেয়, তাহলে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারব।’
নগর পরিকল্পনাবিদের ভাবনা
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নগরের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার সীমিত হয়ে এলেও একে একেবারে সরিয়ে ফেলা সঠিক পদ্ধতি হবে না। ঘোড়ার গাড়ি অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ তৈরি করে। তাই নির্দিষ্ট রুট পরিকল্পনা, আলাদা চলাচলব্যবস্থা, ব্র্যান্ডিং এবং আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঘোড়ার গাড়ির গতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আধুনিক যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে চলতে গিয়ে এটি তাল মেলাতে পারে না। আবার ঘোড়ার গাড়ি চলার কারণে সড়কে যানজট বা স্থবিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে ঘোড়ার গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ঘোড়ার গাড়ির প্রয়োজনীয়তা ভবিষ্যতে থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, অতীতের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং স্মৃতিকাতরতার কারণে ঘোড়ার গাড়ির আবেদন থাকবে। তবে এটি নিয়মিত গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে নয়; বরং অতীতকে জানার এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঘোড়ার গাড়ির চালকরা নানান সংকটের মধ্যেও এই পেশা ধরে রেখেছেন। তবে তাদের আয় ও ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় পেশাটি খুব বেশি লাভজনক নয়। এ অবস্থায় তাদের জন্য আলাদা কোনো সহায়তা প্রয়োজন কি না, এমন প্রশ্নে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে যারা এখনো পেশাটি ধরে রেখেছেন, তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সিটি করপোরেশনের এগিয়ে আসা উচিত। কারণ, ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যে সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে, তা টিকিয়ে রাখা জরুরি। আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হলে চালকরা আরও উৎসাহিত হবেন এবং ঘোড়ার গাড়ি নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী থাকবেন।
এমএমএআর/এমএফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
