একসময় আখ চাষের জন্য পরিচিত ছিল মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বৈলতলা গ্রাম। সময়ের সঙ্গে বদলেছে কৃষির ধরন। আখের জমিতে গড়ে উঠেছে সারি সারি লেবুর বাগান। প্রায় তিন দশক ধরে বিস্তৃত এই চাষ এখন গ্রামের বহু পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। স্থানীয়ভাবে বৈলতলা পরিচিতি পেয়েছে ‘লেবুর গ্রাম’ নামে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের আঁকাবাঁকা পাকা সড়কের দুই পাশসহ বিস্তীর্ণ জমিতে সবুজ লেবুর বাগান। গাছের পাতার ফাঁকে ঝুলছে কাগজি, এলাচি, সিডলেস, কলম্বো ও দেশি জাতের লেবু। বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, বাছাই ও পরিবহনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা।
সংগ্রহ করা লেবু ঝুড়িতে করে সড়কের পাশে আনা হচ্ছে। এরপর আকার ও পরিপক্বতা অনুযায়ী বাছাই করে খাঁচায় ভরা হচ্ছে। পরে সেগুলো ট্রাকে তুলে পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি বাজারে। লেবু উৎপাদন ও বিক্রিকে ঘিরে গ্রামটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে কয়েকজন চাষি লেবু উৎপাদন করে লাভের মুখ দেখেন। পরে তাঁদের সাফল্য দেখে অন্যরাও এ চাষে আগ্রহী হন। ধীরে ধীরে পুরো গ্রামেই লেবুর বাগান ছড়িয়ে পড়ে।
বৈলতলার প্রবীণ কৃষক খোরশেদ আলম (৬৮) জানান, প্রায় ৩০ বছর আগেও এলাকায় আখের আবাদ ছিল বেশি। তবে আখের তুলনায় লেবু চাষে লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকেরা ক্রমে লেবুর দিকে ঝুঁকেছেন। তাঁর মতে, এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বৈলতলা ‘লেবুর গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
প্রায় ২৫ বছর ধরে লেবু চাষ করছেন শাহ আলম (৫০)। তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে লেবুর বাগান করেছেন। শাহ আলম বলেন, সঠিক পরিচর্যা করলে একবার চারা রোপণের পর টানা ১০ থেকে ১২ বছর ফলন পাওয়া যায়। বছরে অন্তত চার দফায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লেবু সংগ্রহ করা সম্ভব। পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময়ে লেবু বিক্রি করে আয় করা যায়।
পৌনে দুই বিঘা জমিতে লেবুর চাষ করেন প্রবীণ কৃষক আব্দুল মালেক (৭৬)। অন্য কৃষকদের মতো তিনিও এই ফসলের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদিত লেবুর ন্যায্য দাম না পাওয়া, রোগবালাই এবং কৃষি উপকরণের বাড়তি খরচ তাঁদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, বৈলতলা তাঁর নিজের গ্রাম। তিনিও প্রায় নয় বিঘা জমিতে লেবু চাষ করেছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ৩০ বছর আগে নিজাম উদ্দিন নামে এক সবজি ব্যবসায়ী পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এ গ্রামে লেবু চাষ শুরু করেন। চাষটি লাভজনক হওয়ায় পরে অন্য কৃষকেরাও এতে যুক্ত হন। বর্তমানে গ্রাম থেকে প্রতিদিন লেবুবোঝাই ট্রাক দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ১১০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বৈলতলা গ্রামেই রয়েছে ৯০ হেক্টর লেবুবাগান। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, লেবু চাষের বিস্তারের কারণে বৈলতলা এখন জেলার অন্যতম আদর্শ গ্রাম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানিয়া তাবাসসুম বলেন, বৈলতলায় এলাচি, সিডলেস, কলম্বো, কাগজি ও স্থানীয় বিভিন্ন জাতের লেবু চাষ করা হয়। এসব লেবুর গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন বাজারে এর চাহিদা রয়েছে।
আখের আবাদ থেকে লেবু চাষে এই পরিবর্তন বৈলতলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে উৎপাদন খরচ, রোগবালাই ও বাজারদরের অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করতে পারলে কৃষকেরা আরও লাভবান হতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই বাংলা/এমএস
