বাইরে থেকে হাসিখুশি, কর্মক্ষেত্রে সফল, বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণবন্ত—অথচ ভেতরে ভেতরে বিষণ্ণতা, হতাশা ও শূন্যতায় ভুগছেন। এমন অভিজ্ঞতা অনেকের জীবনেই থাকতে পারে।
বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও মানসিকভাবে ভালো না থাকার এই অবস্থাকে বোঝাতে প্রায়ই ব্যবহৃত হয় ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতা।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্ণতার লক্ষণ সব সময় কান্না করা, বিছানা থেকে উঠতে না পারা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেউ কেউ নিজেদের কষ্ট আড়াল করে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন। ফলে তাঁদের মানসিক সংকট অন্যদের চোখে পড়ে না, এমনকি তাঁরা নিজেরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে সমস্যাটি বিষণ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ডক্টর অলিভিয়া রেমিস বলেন, বাইরে থেকে খুশি দেখালেও ভেতরে বিষণ্ণ ও হতাশ বোধ করাকে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বলা হয়।
তবে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বিষণ্ণতার কোনো আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাবিষয়ক নাম নয়। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা বোঝাতে ব্যবহৃত প্রচলিত পরিভাষা, যেখানে একজন মানুষ নিজের মানসিক কষ্ট আড়াল করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩২ কোটির বেশি মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। বিষণ্ণতার লক্ষণ ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কারও ঘুম ও ক্ষুধা কমে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুম বা ক্ষুধা দেখা দিতে পারে। ভালো কোনো ঘটনা ঘটলে সাময়িকভাবে মেজাজ ভালোও হতে পারে।
মানুষ কেন বিষণ্ণতা আড়াল করেন?
ডক্টর রেমিসের মতে, কেউ কেউ বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা বিষণ্ণতায় ভুগছেন। তাঁরা নিজেদের উপসর্গকে ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ জীবনের স্বাভাবিক অংশ বলে মনে করতে পারেন।
আবার অনেকের নিজের কাছে প্রত্যাশা বেশি থাকে। তাঁরা দুর্বলতা প্রকাশ করতে চান না কিংবা অন্যের কাছে স্বীকার করতে অস্বস্তি বোধ করেন যে তাঁরা কঠিন সময় পার করছেন। সামাজিক কলঙ্ক, অন্যের বোঝা হয়ে যাওয়ার ভয় এবং কর্মক্ষেত্র বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও মানুষকে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করতে পারে।
অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য নিজের অনুভূতি বা বৈশিষ্ট্য আড়াল করার এই প্রবণতাকে মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় ‘মাস্কিং’ বলা হয়।
বিষণ্ণতার ৭টি লক্ষণ, যেগুলো চিনে রাখা জরুরি
অন্যদের সামনে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা
সব সময় মন খারাপ করে থাকা বিষণ্ণতার একমাত্র প্রকাশ নয়। কেউ কেউ অন্যদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতে থাকেন, কাজে ব্যস্ত থাকেন কিংবা সবার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন। কিন্তু একান্তে তাঁরা মানসিক অবসাদ ও শূন্যতা অনুভব করতে পারেন।
নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া
নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ, অতীতের ভুলের জন্য অতিরিক্ত অনুশোচনা, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীন হয়ে পড়া বিষণ্ণতার সম্ভাব্য লক্ষণ। এ ধরনের চিন্তা বারবার ফিরে এলে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।
আনন্দের বিষয়েও আগ্রহ কমে যাওয়া
আগে যেসব কাজ করতে ভালো লাগত, যেমন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘুরতে যাওয়া কিংবা নিজের পছন্দের কিছু করা—সেসবের প্রতিই আগ্রহ হারিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অনুভূতি থাকলে তা বিষণ্ণতার লক্ষণ হতে পারে।
শরীরে অবসাদ ও ভারীভাব অনুভব করা
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও হাত-পা ভারী লাগা, শরীর চালাতে কষ্ট হওয়া কিংবা ছোটখাটো কাজেও অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় হচ্ছে বলে মনে হতে পারে। বিষণ্ণতার কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা যায়।
সামাজিক মেলামেশা এড়িয়ে চলা
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কিংবা বাইরে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। একাকী থাকতে চাওয়ার এ প্রবণতা নিয়মিত হলে এর কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
ঘুমের পরও ক্লান্তি দূর না হওয়া
দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও সতেজ অনুভব না করা, সারাদিন ঝিমুনি থাকা কিংবা ঘুমের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসা বিষণ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পাশাপাশি দিনের নির্দিষ্ট সময়ে মন খারাপ বা হতাশা আরও তীব্র হতে পারে।
ছোট ঘটনায়ও গভীরভাবে কষ্ট পাওয়া
অন্যের সামান্য সমালোচনা, নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা প্রত্যাখ্যান স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে অযোগ্য বা অবহেলিত মনে হওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
বিষণ্ণতা আড়াল করার ঝুঁকি
যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক বার্নি ডান বলেন, বিষণ্ণতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করে তুলতে পারে। অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখা অনেক সময় এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হয়।
বিষণ্ণতার লক্ষণ উপেক্ষা করলে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দেরি হতে পারে। ডক্টর রেমিস সতর্ক করে বলেন, প্রাথমিক লক্ষণগুলো অবহেলা করা হলে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে এবং আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ পরিভাষাটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি মানুষের অভিজ্ঞতা বুঝতে সাহায্য করলেও বিষণ্ণতার জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিজের অনুভূতি বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত। মনোচিকিৎসা, চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ এবং সামাজিক সমর্থন বিষণ্ণতা মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, এই সাতটি লক্ষণের এক বা একাধিক থাকলেই কেউ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে, বাড়তে থাকলে কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
