ডিএনসিসির উচ্ছেদ অভিযানের পর রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার ফুটপাত এখন অনেকটাই দখলমুক্ত। ফলে স্বস্তিতে চলাচল করতে পারছেন সাধারণ পথচারীরা। কমেছে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা, ফিরেছে চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ। তবে ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পর পথচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসন নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন। একদিকে নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলের অধিকার, অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার তাগিদ—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়েই এখন আলোচনা।
মূলত নগরবাসীর নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চলাচল নিশ্চিত করতেই ফুটপাত নির্মাণ করে সরকার। যানবাহনের কোলাহল, মানুষের ব্যস্ততা ও নাগরিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ মিলিয়ে প্রতিদিনের ঢাকা এক কর্মচঞ্চল মহানগরী। এমন পরিস্থিতিতে ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলে পথচারীদের ভোগান্তি কমে এবং নগরজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
স্বপ্নের শহর ঢাকা, বাস্তবতায় নানা সংকট
ঢাকা শুধু একটি রাজধানী নয়, স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকারও একটি শহর। জীবিকা, শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের আশায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ এ নগরীতে আসেন। তাদের অনেকের কাছেই ঢাকা সম্ভাবনার শহর, যেখানে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেন তারা।
দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই মহানগরীর কর্মব্যস্ততা। শুধু দেশি নাগরিক নন, কর্মসূত্রে বহু বিদেশিও ঢাকায় আসেন। তাদের কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে এ শহরে বসবাস করছেন।
প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ঢাকা সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হলেও নগরায়ণের চাপ ও অপরিকল্পিত বিকাশের কারণে এখানে নাগরিক সুবিধার ঘাটতি প্রকট হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত ফুটপাত, প্রশস্ত সড়ক, উন্মুক্ত স্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি অনেক ক্ষেত্রেই।
এর ফলে নগরবাসীর প্রতিদিনের চলাচলে তৈরি হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা। বিশেষ করে ফুটপাত দখল হয়ে গেলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নামতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং নগরজীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফুটপাত দখলের কারণে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে না পারলে তাদের এই অধিকার চর্চা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে জনসাধারণের চলাচলের অধিকার রক্ষা করে ফুটপাতের ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বিঘ্নে ফুটপাত ব্যবহার করাও নাগরিকদের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কেবল চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয় নয়; বরং একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
ফুটপাত তুমি কার
নগরজীবন বৈচিত্র্যময় হলেও ঢাকার পথে বের হলে ফুটপাত নিয়ে ভোগান্তির অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট, পসরা ও মানুষের ভিড়ের কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। সকাল কিংবা সন্ধ্যা— ব্যস্ত সময়ে এসব এলাকায় পথ চলা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে।
ফুটপাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এমন বিশৃঙ্খলায় একদিকে যেমন পথচারীরা বাধার মুখে পড়েন, অন্যদিকে যানবাহনের চাপ ও যানজটও বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মানুষকে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করে।
নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও অনেক সময় এর সুফল স্থায়ী হয় না। অভিযানের পর কয়েক দিন ফুটপাত ফাঁকা থাকে, চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়। পথচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও দখল শুরু হয়। এভাবেই উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র চলতে থাকে।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে— ফুটপাত কার জন্য? পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য নির্মিত ফুটপাত কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে দোকানপাট ও পসরা বসানোর জায়গায় পরিণত হয়? আবার, যারা এসব ফুটপাতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অভিযান কতটা স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে?
জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে হকার
ফুটপাতের হকারদের বিষয়টি কেবল দখল বা উচ্ছেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের বড় একটি অংশ নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কেউ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন, কেউ দিনমজুরি বা ছোট চাকরি হারিয়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ সামান্য পুঁজি নিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রতিদিন সকালে পণ্যসামগ্রী নিয়ে ফুটপাতে বসেন তারা। দিন শেষে সামান্য লাভ নিয়ে ঘরে ফেরেন। এই আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়।
ফলে উচ্ছেদ অভিযান তাদের কাছে শুধু দোকান সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়; বরং জীবিকা হারানোর আশঙ্কাও। তবে তাদের জীবিকার বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফুটপাত দখল করে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানেই সামনে আসে মূল প্রশ্ন— উচ্ছেদের পর হকাররা কোথায় যাবেন? তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, নির্দিষ্ট ব্যবসাস্থল কিংবা নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে কি?
নগর কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযান ফুটপাত খালি করার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হলেও জীবিকার সংকট অমীমাংসিত থাকলে পুনর্দখলের আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি হকারদের পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানিয়েছিলেন, ঢাকায় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রেখে নীতিমালা অনুযায়ী হকারদের পুনর্বাসন করা হবে। মূল সড়কে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। যেসব সড়কে প্রশস্ত ফুটপাত রয়েছে, সেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত জায়গা উন্মুক্ত রেখে সীমিতসংখ্যক নিবন্ধিত হকারকে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদের জন্য হলিডে মার্কেট ও নাইট মার্কেট চালু করা হবে।
সে সময় তিনি বলেছিলেন, সরকার নির্ধারিত ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। নির্ধারিত ফি দিয়ে হকারদের নিবন্ধন ও তা নিয়মিত নবায়ন করতে হবে এবং নির্ধারিত সড়ক ও সময়ে ব্যবসা করতে হবে। এর মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব।
যদিও সেই নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। রিটকারীদের দাবি ছিল, এ ধরনের বরাদ্দের ফলে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত হতে পারে এবং যানজট সৃষ্টি হতে পারে। এতে সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত চলাফেরার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিটে আরো দাবি করা হয়েছিল, এ ধরনের কার্যক্রম সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৭ ধারার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
এদিকে নতুন করে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলছে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযানকে অমানবিক বলে দাবি করছেন হকারদের নেতারা।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হকারদের নিয়ে বিক্ষোভ-সমাবেশ করে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন। সমাবেশ থেকে হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তাদের দোকান ও চৌকি উচ্ছেদ বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়।
জুতার দোকানিদের অবৈধ দখল থেকে মুক্ত হওয়ার পর সেই রাস্তা দিয়ে জনসাধারণ নির্বিঘ্নে চলাচল করছে: মিরপুর-১০
বক্তারা বলেন, আগে হকারদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে তাদের দোকানপাট ও চৌকি সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রেখে হকার নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
তাদের অভিযোগ, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হকারদের দোকানপাট উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এ সময় মালামাল নষ্ট করা, আগুন দেওয়া এবং গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর মতো ঘটনাও ঘটছে বলে তারা দাবি করেন।
সমাবেশে বক্তারা আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে হকাররা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রাও এই পেশার সঙ্গে জড়িত। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়বেন।
বক্তাদের ভাষ্য, অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দরিদ্র হকারদের জীবিকার ওপর আঘাত করা হচ্ছে। হকাররা পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ করেন। তাই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে তাদের উচ্ছেদ করা অমানবিক।
উচ্ছেদের পর বদলে গেছে মিরপুর-১০
মিরপুর-১০ এলাকায় হকার উচ্ছেদের পর ফুটপাতের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় রিকশাচালক, পথচারী ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, আগে ফুটপাত ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ভিড়, দোকানপাট এবং যানবাহনের চাপের কারণে চলাচল করা কঠিন ছিল। উচ্ছেদ অভিযানের পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে।
পায়ে চালিত রিকশাচালক মোহাম্মদ শরিফ বলেন, হকারদের দখলমুক্ত হওয়ার পর থেকে এখানকার পরিবেশ আগের তুলনায় মনোরম। যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমেছে। সবাই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছেন। আমরাও সুন্দরভাবে রিকশা চালাতে পারছি।
মারিয়া নামের এক মধ্যবয়সী পথচারীও উচ্ছেদের পর স্বস্তি ফিরে আসার কথা জানান। তিনি বলেন, আগে তো এখান দিয়ে হাঁটাই যেত না। শুধু মানুষ আর মানুষ, মনে হতো মানুষের খেত। হকার উচ্ছেদের পর পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। হইচই কমেছে। আগে পা ফেলার জায়গা ছিল না, এখন যাতায়াত করতেই ভালো লাগে।
তিনি আরো বলেন, আমি চাই, এই পরিবেশ যেন সব সময় থাকে। এত মানুষের ভিড়ে ঘর থেকে বের হতেও ভালো লাগত না। এখন চলাচল করতে স্বস্তি লাগে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরেক পথচারী রুবিয়া খাতুন। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ঢাকায় আসার পর থেকেই যেদিকে তাকিয়েছি, হকার আর হকার দেখেছি। কোথাও তেমন ফাঁকা রাস্তা দেখিনি। তবে হকার উচ্ছেদের পর আমার ভালো লাগছে। রাস্তাটাকে এখন নিজের বলে মনে হচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের পর ফুটপাত অনেকটাই দখলমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে পথচারীদের মধ্যে। আগের তুলনায় চলাচল সহজ হয়েছে, কমেছে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা। তবে এই পরিবর্তন কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানের পর কিছুদিন ফুটপাত ফাঁকা থাকলেও পরে আবার দখল শুরু হয়। তাই শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিত নজরদারি, ফুটপাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবসাস্থল নির্ধারণ করা জরুরি। তাহলেই পথচারীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি পুনর্দখলের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
শাহ আলী মার্কেটের এক দোকানি বলেন, আগে দোকানের সামনে রিকশা আর মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। চেঁচামেচিও অনেক বেশি ছিল। এ কারণে ক্রেতারাও ঠিকমতো আসতে পারতেন না। এখন পরিবেশ অনেকটা শান্ত হয়েছে। এটাই সবচেয়ে ভালো লাগছে।
স্থানীয়দের এসব বক্তব্যে ফুটপাত দখলমুক্ত থাকার ইতিবাচক দিক উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তারা চান, এই পরিবর্তন যেন সাময়িক না হয়ে স্থায়ী হয়। তবে উচ্ছেদ অভিযানের পর মিরপুর-১০ এলাকার পরিবেশ, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং ট্রাফিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
মিরপুর-১০ পুলিশ ফাঁড়িতে থাকা সার্জেন্টসহ সংশ্লিষ্টরা রাইজিংবিডিকে জানান, এ বিষয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ নেই। বিস্তারিত জানতে পুলিশের মিডিয়া বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তারা। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
দখলমুক্ত রাখা ও প্রশাসনের উদ্যোগ
হকার উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যাতে নতুন করে হকার বসতে না পারেন, সে বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে উচ্ছেদ-পরবর্তী নগর পরিবেশ উন্নয়নের অংশ হিসেবে ঢাকার সেগুনবাগিচা এলাকায় দেয়ালে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি আঁকানো হয়েছে। দেয়াল ও খালি স্থানগুলোকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে নগর পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা করছে ডিএনসিসি বলেও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সড়কের পরিবেশ আরো শান্ত, সবুজ ও মনোরম করতে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জন্য দ্রুত বিকল্প স্থান নির্ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের এমন জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে, যেখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারেন।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যেমন নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য জরুরি, তেমনি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজধানীর অনেক হকারের আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসা। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে তারা আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। এ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে ব্যবসার সুযোগ, নিবন্ধনব্যবস্থা এবং হলিডে মার্কেট বা নাইট মার্কেট চালুর মতো উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। পরিকল্পনাবিদদের মতে, হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে ফুটপাতের স্বাভাবিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে হকারদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগও বজায় থাকবে।
নগর ব্যবস্থাপনায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার মধ্যে সমন্বয় করতে সিটি করপোরেশনের কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন— এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, আমাদের দেশটাও ছোট, সেই ছোট দেশের একটি শহর ঢাকা। এখানে অনেক বসতি, অথচ আমরা তাদের হাঁটাচলার জায়গাটুকুও দিতে পারছি না। বর্তমান সময়ে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যেকোনো রাষ্ট্রেই হকার সমস্যা রয়েছে। তবে এ সমস্যা সুন্দরভাবে সমাধানের পথও আছে।
সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক উন্নত রাষ্ট্রে হকারদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। ধরুন, সেখানে হকাররা সকালে দোকান বসান, আর বিকেলে সব গুছিয়ে পুরো রাস্তা ফাঁকা করে বাড়ি ফিরে যান। অর্থাৎ, এটি একধরনের নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ব্যবস্থা। আমাদের দেশে, বিশেষ করে রাজধানীতে, যেহেতু মানুষ বেশি, তাই আধুনিক এই ধারণাগুলো কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, হকারদের উচ্ছেদের পর তাদের পরিবারের জীবিকা ও অন্যান্য বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে সরকারকে। কেননা দেশের অর্থনীতিতে হকারদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই তাদের বিষয়ে এমন কিছু কার্যকর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি, যা রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনা এবং হকার—উভয়ের জন্যই কল্যাণকর হয়।
একই বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির রাইজিংবিডিকে বলেন, রাজধানীর কোনো স্থান থেকেই হুট করে হকার উচ্ছেদ করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, হকাররাও এ দেশের নাগরিক এবং তাদেরও সব ধরনের অধিকার রয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো, যারা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন, তাঁরাও হকারদের নিয়ে রাজনীতি করেন। ফলে আমার মনে হয়, যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, হকারদের সঙ্গে পরামর্শ করেই তা নেওয়া উচিত। এতে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।
তিনি আরো বলেন, হকারদের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত। একই সঙ্গে দেশকে অবশ্যই সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই হকারদের জন্য সিটি করপোরেশনকে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। হলিডে মার্কেটের মতো ধারণাসহ অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে হকার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি নগরীর ফুটপাত চলাচলের উপযোগী রাখা সম্ভব।
