পেটের বাড়তি মেদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন অনেকেই। ওজন কমাতে কেউ খাবারের পরিমাণ কমান, কেউ নিয়মিত ব্যায়াম করেন, আবার কেউ অনুসরণ করেন নানা ধরনের ডায়েট। কিন্তু এত চেষ্টার পরও যখন পেটের মেদ কমতে চায় না, তখন হতাশ হয়ে পড়েন অনেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে শুধু খাবারের পরিমাণ কমানোই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস, পানীয় নির্বাচন, রান্নার পদ্ধতি এবং নাশতা খাওয়ার অভ্যাসও শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমার কারণ হতে পারে। তাই পেটের মেদ কমাতে বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুষ্টি ও লাইফস্টাইল মেডিসিন কোচ এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তানয় মান্ডোয়ারা এমন পাঁচটি অভ্যাসের কথা জানিয়েছেন, যেগুলো ওজন নিয়ন্ত্রণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক-
১. ডায়েট সোডাকেই নিরাপদ পানীয় ভাবা
চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে অনেকেই ডায়েট সোডা বেছে নেন। এসব পানীয়ে চিনি ও ক্যালোরি কম থাকতে পারে। তবে তাই বলে এগুলোকে প্রতিদিনের পানির বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়।
বারবার মিষ্টি স্বাদের পানীয় পান করার অভ্যাস থাকলে নিজের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ঘুমের সময়সূচি ও খাবার খাওয়ার অভ্যাসও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ডায়েট সোডা পছন্দ হলে তা পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন।
২. রান্নার তেলের পরিমাণ হিসাব না রাখা
রান্নায় সামান্য তেল ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অনেকেই এর ক্যালোরি হিসাব করেন না। অথচ অল্প পরিমাণ তেলেও যথেষ্ট ক্যালোরি থাকে। রান্নার সময় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে প্রতিদিনের মোট ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে সবজি, ডাল, গ্রেভি কিংবা ভাজাপোড়া তৈরির সময় তেলের ব্যবহার খেয়াল রাখা দরকার। রান্নায় তেল মেপে ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি ভাজার পরিবর্তে সেদ্ধ, ভাপে রান্না, গ্রিল বা রোস্ট করার মতো পদ্ধতি বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে ওজন কমানোর জন্য খাদ্যতালিকা থেকে সব ধরনের চর্বি বাদ দেওয়া উচিত নয়; বরং পরিমাণ ও ধরন সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
৩. ভাত-রুটির তুলনায় প্রোটিন ও সবজি কম খাওয়া
ভাত ও রুটি আমাদের দৈনন্দিন খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে খাবারের প্লেটে শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণ বেশি থাকলে এবং প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার কম থাকলে খাদ্যতালিকায় ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
এ সমস্যা এড়াতে ভাত বা রুটির সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। ডাল, ছোলা, ডিম, মাছ, দই ও পনির হতে পারে ভালো বিকল্প। এতে খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে। ব্যক্তির শারীরিক পরিশ্রম ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সালাদ খাওয়ার সময় উপকরণে নজর না দেওয়া
সালাদকে সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সালাদে কী কী উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপরও এর ক্যালোরির পরিমাণ নির্ভর করে।
অতিরিক্ত মেয়োনিজ, ক্রিমি ড্রেসিং, চিজ কিংবা বেশি পরিমাণ বাদাম যোগ করলে সালাদের ক্যালোরি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এসব উপকরণ পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা ভালো।
সালাদে শসা, টমেটো, গাজর ও অন্যান্য সবজির পাশাপাশি ছোলা, সেদ্ধ ডিম কিংবা গ্রিল করা মুরগির মাংস রাখতে পারেন। এতে খাবারে আঁশ ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়বে এবং পেট ভরা রাখতে সহায়তা করবে।
৫. পরিমাণ না মেপে বারবার বাদাম খাওয়া
বাদামে রয়েছে উপকারী অসম্পৃক্ত চর্বি, প্রোটিন, আঁশ ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। তাই সুষম খাদ্যতালিকায় বাদাম রাখা যেতে পারে। তবে বাদামে ক্যালোরির ঘনত্ব বেশি হওয়ায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
সকালে, দুপুরে কাজের ফাঁকে কিংবা সন্ধ্যায় বারবার একমুঠো করে বাদাম খেলে দিনের শেষে মোট ক্যালোরি গ্রহণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত নাশতা হিসেবে বাদাম খেলে এই পরিমাণ আরও বাড়ে।
এ জন্য প্যাকেট থেকে সরাসরি বাদাম না খেয়ে ছোট একটি বাটিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন। সম্ভব হলে কম লবণযুক্ত বা লবণ ছাড়া বাদাম বেছে নিন।
ভুঁড়ি কমাতে যা মনে রাখবেন
পেটের মেদ কমানোর জন্য কোনো একটি খাবার বাদ দেওয়া বা বিশেষ কোনো পানীয় পান করাই যথেষ্ট নয়। বরং সুষম খাবার, পরিমিত ক্যালোরি গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধারাবাহিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
মনে রাখতে হবে, শুধু পেটের নির্দিষ্ট অংশের মেদ কমানো যায় না। শরীরের সামগ্রিক চর্বি কমার সঙ্গে সঙ্গে পেটের মেদও কমতে পারে। তাই দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় কঠোর ডায়েটের পরিবর্তে নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।