ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে রাশিয়া পুনরায় ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। ইউরোপের এমন অবস্থানকে ‘রাজনৈতিক সিজোফ্রেনিয়া’ আখ্যা দিয়ে পুতিন বলেছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে রাশিয়াকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি এক সাংবাদিকের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা উঠে আসে।
প্রাসঙ্গিক সংবাদ
পুতিন ইউক্রেনের জনগণকে রাশিয়ার ভ্রাতৃপ্রতিম জাতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, রুশ ও ইউক্রেনীয়দের মধ্যে ঐতিহাসিক ও জাতিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং তারা মূলত একই জাতির অংশ। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেশটির প্রশাসন নিজেদের নাগরিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, ইউক্রেনে সাধারণ মানুষকে রাস্তাঘাট থেকে ধরে নিয়ে জোরপূর্বক সম্মুখসমরে পাঠানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, এসব মানুষের অনেকেরই যুদ্ধ করার মানসিক প্রস্তুতি বা আগ্রহ নেই। তবে পুতিনের এসব বক্তব্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনে নেই।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক প্রস্তুতি ও রাশিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রসঙ্গে পুতিন বলেন, ইউরোপের পক্ষ থেকে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা করা হচ্ছে, যা তাঁর মতে বাস্তবতাবিবর্জিত। তিনি দাবি করেন, অতীতে যারা রাশিয়াকে সামরিকভাবে পরাজিত করার চেষ্টা করেছে, তাদের মতো বর্তমান বিরোধীরাও শেষ পর্যন্ত এই অবস্থানের অসারতা বুঝতে পারবে। তাঁর মতে, রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই অধিক যুক্তিসংগত।
পুতিন আরও বলেন, ইউরোপের সাধারণ মানুষ রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। রাশিয়াও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না বলে দাবি করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনার উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে পুতিন জানান, রাশিয়া ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ ও আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রস্তাবিত এই আলোচনায় রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ সহকারী ইউরি উশাকভ এর আগে জানিয়েছিলেন, আগামী ১০ নভেম্বরের পর এই বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আলোচনার চূড়ান্ত তারিখ ও বিস্তারিত কর্মসূচি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এর আগের দিন নরওয়ের রাজধানী অসলেতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন তিনি। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য পথ নিয়ে এসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের কাছে এই কূটনৈতিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সরাসরি আলোচনা একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে। তবে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থানের পার্থক্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
ফলে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা পুনরায় শুরু হলে তা শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি আনতে পারে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আলোচনার উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নেয় কি না এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, তার ওপরই ইউক্রেন সংকটের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
